সুইসাইড আর শৈশবের দুঃখ গুলো

smsudipbd
smsudipbd
চারতলার ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা ।একটি পা শূণ্যে,আরেক পাও বাড়িয়েছে লাফিয়ে পড়বে বলে ।
কিরে ,সাকিব ? কি করিস ওখানে দাঁড়িয়ে।
পিছনে ফিরে তাকাল বালক ।এবারও হল না,মুক্তিটা এল না,হুম্ম মুক্তি তো ,চিরতরে মুক্তি।
এই গল্পটা ঠিক গল্প না,এক্টা নয় দশ বছরের বাচ্চা ছেলের নিত্যদিনের বাস্তবতা,আমার নিজের।
নয় বছর বয়সেই হোস্টেলে আমার জীবন শুরু হয়।ক্লাসে প্রায় দেড়শ জন ছাত্র ছিল।এদের কার সাথেই আমার বনিবনা হত না।ছোটবেলায় একটু বেশিই বোকা ছিলাম।হোস্টেল লাইফে কিছু আনাড়ি থাকেই,যারা অন্যদের খেলার বল হয়ে যায়,ক্রিকেট বল,যাকে ইচ্ছেমত পেটানো যায় ব্যাট দিয়ে ,টু শব্দটিও করে না।
কোথাও যাচ্ছি,পিছনের জনের ইচ্ছে হল,একটু খেলা যাক,দিল টকাস করে মাথায় মেরে।
রেগে গিয়ে বললাম ,কিরে মারলি কেন?

-তুই দেখছিস,আমি মারছি?দে প্রমাণ দে।শালা ,প্রমাণ ছাড়া আমাকে দোষ দিস!-আরো দুটো ঠকাস ।ভ্যাব্লার মত মার খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকি আমি ।সেই যে মেরেছে পিছন থেকে ,আমি তা ভালভাবেই জানি ।কিন্তু প্রমাণ ছাড়া তাকে দোষ দেওয়া ‘ অপরাধ’ তো বটে।তাই শাস্তিআমি মাথা পেতে নিতাম।আবার সামনে হাটা এবং আবার তার ব্যাটিং এর লোভনীয় স্পেল হতাম।
এই খেলা কতবার হত?দিনে কমপক্ষে দশবার বার,আই রিপিট কমপক্ষে দশবার বার।কতদিন এভাবে চলেছে?টানা চার বছর।

আমি জানি ,এসব বিশ্বাস করা কঠিন,আমার নিজেরই বিশ্বাস হতে চায় না এখন ।কিন্তু ওয়াল্লাহি এটা সত্য,মধ্যরাতে ভেজা চোখে এই টাইপিং যেমন সত্য ,দশ বছরের ঐ বাচ্চার গল্পটাও তেমনি সত্য।
বাসাতেও কখনোই বলতে পারতাম না ।আম্মু মনে করত, হোস্টেলে না যেতেই এই অজুহাত করছি।আম্মুকে ভয়ও পেতাম ভীষন।তাই কখনো বলার সাহস হয়নি।সময় যখন অসহ্য লাগত,আমি সেই ছাদে চলে যেতাম ,নাহ,এবার আমার চাই,মুক্তি চাই এসব কিছু থেকে ।শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে উঠেনি। শেষ মুহুর্তে মনে হত ,আমার মা এই চলে যাওয়া মানতে পারবে?আর আমার ছোট বোন?
বারো বছর বয়সে হঠাত করেই সব পালটে গেল।জী না,আমার সাথে এই ‘মজার ‘খেলা শেষ হয়ে যায়নি তখনো।কিন্তু বেচে থাকার অর্থ খুজে পেলাম আমি ।

একজন আলেমের বয়ান শুনে দারুণভাবে আলোড়িত হলাম।আমি নিয়মিত কুরান শরিফ পড়া শুরু করলাম।অনুবাদ পড়তাম নিয়মিত।হঠাত করে অনুভব করলাম আমি তো একা নই। আমার সাথে একজন আছেন,যিনি আমাকে বানিয়েছেন ।এই ব্যাপারটাই আমার দিশেহারা ভাব কাটিয়ে দেয়,আমাকে সচেতন করে তোলে।কষ্টের কথা ভেবে হাহাকার না করে এর প্রতিকার ভাবতে আমাকে সাহায্য করে।
যখন মন খুব খারাপ হত ,আমি সুখের কথাগুলো ভাবতাম।আমার রেজাল্টের কথা,বাসার বন্ধুদের কথা ,মায়ের আদরের কথা,নানান জাতীয় প্রতিযোগীতায় আমার পাওয়া পুরস্কারের কথা । আমি কথা বলা কমিয়ে দিই।সারাদিন নিজের মত করে থাক্তাম।আর প্রচুর বই পড়তাম। 

এর মানে এই না,এরপরের সব সময়ই সুখের ছিল।আমার জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটে এস এসসি পরীক্ষার পর।এক সমবয়সী ছেলের সাথে আমার সামান্য ঝামেলা হয়।ছেলেটার বাবার সাথে আমার খুব ভাল সম্পর্ক ছিল।উনি আমাকে খুব পছন্দ করতেন।দোষটা যে আমার না ,এটা বোঝানোর জন্য
আমি তার কাছে যাই।কিন্তু তিনি আমার কোন কথা না শুনেই আমাকে দু দুটো চড় মারেন ।এই ঘটনাটা ঘটে আমাদের বাসার কাছেই ,শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় বহু মানুষের সাম্নে।পাড়ার সবচেয়ে ভাল ছেলে হিসেবে আমার ভীষন সুনাম ছিল।এলাকার যেকোন মুরব্বি মানুষও দেখা হলে দাঁড়িয়ে আমার সাথে কথা বলত।এই ঘটনার পর কত বাজে চিন্তা যে মাথায় এসেছে।আমার ফোবিয়ার মত হয়ে যায়।কেউ আমার দিকে তাকালে মনে হত,এই মানুষটা নিশ্চয় আমার চড় খাওয়া দেখেছে। কারো সাথে কথা বললেই মনে হত,এখনই হয়তো মানুষ্টা রেগে যাবে,আমাকে সবার সামনে চড় মেরে বসবে।রিক্সা,মাহেন্দ্রা থেকে নামার পর মনে হত, পকেটে হাত দিয়ে হয়তো টাকা পাব না। ।কাচুমুচু মুখে রিক্সাওয়ালাকে ব্যাপারটা বলতে হবে আর রিকশাওয়ালা আমাকে চড় দিয়ে বসবে।অথচ বেশ মনে আছে,আমি টাকা নিয়েই বের হয়েছি। তারপরো ভয় হত।যেখানে ব্যাপারটা ঘটেছিল,আমি তার আশেপাশে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম।এখনো যেতে পারি না।আমার কেমন দম বন্ধ লাগে। 

সুইসাইডের কথা ভেবেছি,সবাইকে ছেড়ে দূরে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছি।কিন্তু তারপরই মনে পড়েছে,আমার মধ্যবিত্ত বাবা তার হিসেবের খুচরোগুলো কিভাবে আমার পিছনে উজাড় করেছেন,মনে পড়ে মায়ের অদ্ভুত স্বপ্নালু মুখ,এস এসসির রেজাল্ট শুনেই যার মনে হয়েছিল ,ছেলে তাহলে ডাক্তার হচ্ছে!ছোট বোনের কথা ভাবি,যে বলে,ভাইয়া ,আমি কিন্তু বান্ধবীদের বলে দিয়েছি,ডাক্তার হলে তুমি ওদের ভিজিট নিবে না। 

সত্যি কথা বলতে কি,আমাদের সবার জীবনে দুঃখ আছে ,কষ্ট আছে।এবং হ্যা ,নিজের দুঃখটা মানুষের কাছে সবসময়ই বড় মনে হয়। কিন্তু প্লিজ ,একবার ভাবুন তো আফ্রিকার সেই শিশুর কথা,সারাদিন যার কপালে এক টুকরো রুটি জুটে না। স্কুলে পড়ালেখা ? সে তো অলীক স্বপ্ন ।ভাবুন তো সেই রোহিঙ্গা বালকের কথা ,যে তার মাকে , বোনকে রেপ হতে দেখেছে চোখের সাম্নে,পুকুরের কচুরিপানার মতই যার জীবন এখন কাটে উদ্বাস্তু শিবিরে শিবিরে। পুলিতজার বিজয়ী সেই ছবির কথা মনে আছে ,এক হাড় সর্বস্ব মানুষ খটখটে মাঠে বসে আছে ,তার পিছনে এক শকুন অপেক্ষা করছে ,কখন মানুষ্টা মারা যায়? আপনার কষ্ট কি ঐ মানুষ্টার চেয়েও বেশি?আপ্নার অপমান কি সেই রোহিঙ্গা বালকের চেয়ে বেশি?

আমরা ,আধুনিক ব্রয়লাররা একটুতে হতাশ হয়ে পড়ি।ব্রেক আপ হল কি সামান্য ঝগড়া,ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই,বেচে থাকতে আর ভাল লাগে না।
দোহাই লাগে ফেসবুকে সময় কমিয়ে ভাল কিছু করার চেষ্টা করুন ।সুন্দর কোন বই পড়ুন।কুরান শরিফ এর অনুবাদ পড়ুন ,ভিন্ন ধর্মের হলে গীতা পড়ুন ,বাইবেল পড়ুন।প্রার্থণা বলি বা ইবাদত,আপ্নার স্রষ্টার জন্য কিছু সময় বের করুন ।এই ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।মনে রাখবেন ,এই ঐশি গ্রন্থগুলো শতাব্দির পর শতাব্দি কোটি কোটি মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে,এখনো দিচ্ছে।আপনি শুরু করুন ,দেখবেন ,আপনি ও আত্নিক শান্তি পাচ্ছেন।
Ar-Ra'd 13:28
ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ ٱللَّهِۗ أَلَا بِذِكْرِ ٱللَّهِ تَطْمَئِنُّ ٱلْقُلُوبُ
Those who have believed and whose hearts are assured by the remembrance of Allah . Unquestionably, by the remembrance of Allah hearts are assured."
আপনি যে মতেরই হোন না কেন,অবশ্যই ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন ।যদি তা না করতে পারেন,তবে নিশ্চিত থাকুন ,হতাশা ঘৃণার আরেক বৃত্তে আপনি আটকা পড়েছেন।ভিন্ন মতের ঐশিগ্রন্থগুলোও পড়ে দেখতে পারেন ।ভগবান বলি বা আল্লাহ,তার কাছে প্রার্থনা করুন ,যেন তিনি আপনাকে সত্যিটা গ্রহণের সামর্থ্য দেন। 
আপনার মায়ের হাতের পিঠার কথা মনে আছে?আপনি যখন রোগে কাতরান,মনে আছে ,কিভাবে রাত জেগে আপনার পাশে বসে থাকেন?মনে পড়ে,আপ্নার বাবা সুখি সুখি চোখে আপনার দিকে তাকিয়ে কিভাবে অন্যদের শোনান,’আর চাকরি করতে ইচ্ছে করে না,ভাবছি , খুব দ্রুত ছেড়ে দিব’?
এই সুখ আর আস্থার জায়গার কি হবে আপনি চলে গেলে ,একবার ভেবেছেন?

আপনার কি মনে হয় ,বাবামার এই আস্থার জায়গাটুকু আপনি রাখতে পারেননি ,তাই আর মুখ দেখাতে চান না?একবার ভাবুন তো ।আপনি তাদের সামনে দাড়াতে পারবেন না,তাই সুইসাইড করতে চান।আপনাকে হারানোর ধকল সামলে তারা ঘুরে দাড়াতে পারবেন ?
ভাবুন ,ভালবাসার মানুষগুলো নিয়ে ভাবুন।তাদেরকাছে আপনি কতখানি,তা একবার ভাবুন।জীবনে বেচে থাকার অর্থ খুজুন ।
(আমার খুব কাছের এক বন্ধু তার জীবনের কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিল।ব্যাপারটা দারুণ গোপন আর স্পর্শকাতর ।কিন্তু ,মনে হল,এই অভিজ্ঞতা আজ কারো লেখা দরকার।হয়তো এই লেখা পড়ে কেউ জীবনের অর্থ খুজে পাবে ,নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখবে।লেখাটা লিখেছি উত্তম পুরুষেই ,তার জবানিতেই।লেখাটা আমার হলেও গল্পটা আমার না।)
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!