গল্পঃভাঙা শৈশব।

গল্পঃভাঙা শৈশব।

তখন পরিবারের আর্থিক অবস্থা কোনঠাসা।বয়স কম।বড়দের কথার গোপন অর্থ খোজার বয়স।কৈশরে এক রকম বয়স থাকে,বড়রা কি বললো তা মন দিয়ে শোনা এবং তার গোপন অর্থ বের করা।অর্থ বুঝে ফেলার পর মনে মনে খুশি হবার সময় চলছিলো।
গল্পঃভাঙা শৈশব।
গল্পঃভাঙা শৈশব।

গ্রামের স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছি।লিখা পড়ায় ভাল।বেশ ভাল!আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন ম্যাডাম।তার স্বামী বাসায় প্রাইভেট পড়াতেন।দল বেধে ছেলে মেয়েরা পড়তে যাই।উঠনে পাটি পেরে গোল হয়ে বসা।ভালো লাগার বয়স যা দেখি ভাল লাগে।কিন্তু স্যারকে আমার ভিষন রকম অপছন্দ হলো।একদিন সতেরর ঘরের নামটা শিখতে দিলেন। স্যারের পাশের বাড়িতে আমার এক সহপাঠী থাকতো নাম করিম।সে পরেরদিন গরগর করে নামতা বলে দিলো।আমি নামতা গুলিয়ে ফেললাম।স্যার করা করে বললেন আমি কোনোদিন করিমের সাথে পড়ায় পেরে উঠবো না।আরো শক্ত কিছু কথা বলেছিলেন।

স্যারের বক্তব্য শৈশব মস্তিষ্ক সহজভাবে গ্রহন করলো না।নিউরনের যেই অংশে সৃতি জমা থাকে,সেখানে স্যারের তিক্ত ভাষ্য জমা করে রাখা হলো।বাড়িতে গিয়ে বাবাকে বললাম,আব্বা আমি আর ঐ স্যারের কাছে পড়বো না।বাবা বললেন পড়বি না কেন? মাত্র তো ১৫দিন গেলি।আমি বললাম আব্বা আপনি পুরো মাসের বেতন দিয়ে আসেন,আমি যাবো না।ছেলের জেদের কাছে হোক কিংবা সন্তানের মন রাখার জন্যই হোক বাবা পরদিন টাকা দিয়ে এলেন।ঐ সময়ের আর্থিক অবস্থার বিবেচনায়, টাকাটা দিতে বাবার কতটা কস্ট হয়েছিলো তখন বুঝতে পারিনি।এখন পারি।

নতুন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়া হয়।কিন্তু ক্লাস টিচারের স্বামীর কাছে প্রাইভেট পড়তে হবে তাই ছিলো নিয়ম।ক্লাসের সবাই তাই করতো।আমি ছিলাম ব্যাতিক্রম।স্যার ও ছেরে দেওয়ার পাত্র না।আমাকে নিয়ে নিম্নমানের যতোকিছু বলা সম্ভব তার কিছুই বাদ রাখেন নি।লিখা পড়া করি না।বাজে ছেলে,এই বয়সে সিগারেট খাই।ইত্যাদি ইত্যাদি।

তার এসমস্ত রটনায় সহপাঠীদের সাথে দুরুত্ব বাড়তে লাগলো।তারাও ধরে নিয়েছে আমি নোংরা ছেলে।আমার সাথে মিশলে তাদের পড়াশোনার চৌদ্দটা বেজে যাবে।সবার অপছন্দের তালিকার প্রথম নামটা আমার।স্কুলে যাওয়া বন্ধ।পরীক্ষা ছাড়া ক্লাস করা বা স্কুলের অন্যকোনো অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার নিয়ম ছিলো না।নিজের করা নিয়ম।শিশুরা নিজেরা নিয়ম তৈরী করতে পছন্দ করে এবং সেই নিয়মে শতভাগ আস্থা থাকে।

ইংরেজী পরীক্ষা চলছিলো,আমি একলা এক বেঞ্জে আমার পাশে কেও বসবে না।এতে তার পরীক্ষায় শনির প্রভাব পরার আশঙ্কা থাকে।সে সময় গ্রামের স্কুলগুলোতে দেখাদেখির চল ছিলো।একে অন্যেরটা দেখে পাশ করার রীতি গুনে গুনে মান্য করা হতো।সবাই মিলেমিশে দেখাদেখি করে পরীক্ষা দিচ্ছে।আমি একা।আমি যে পরীক্ষার একটা অংশ।এটা তখন কারো মাথাতে থাকা উচিৎ ছিলো না।

এমন সময় ক্লাসে ঢুকলেন সেই স্যার।ম্যাডাম অসুস্থ বদলি হিসেবে তার গার্ড।ক্লাসে ঢুকেই সে সবাইকে করা করে বললেন কেও যেন আমায় সাহায্য না করে।পাশে থেকে বন্যা বলে উঠলো স্যার ও তো একটা চোর।পড়া পারে না কিছু না।খায় বিড়ি ওরে দেখায় কে?
গ্রামের মেয়েদের মধ্যে চোর শব্দ ব্যাবহারের একটা দুর্বলতা আছে।তারা যে কাউকে চোর বলার সাহসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠে।

আমার মনে হয়েছিলো শ্রেনীকক্ষে এমন বাজে ভাষার জন্য বন্যার শাস্তি হওয়া উচিৎ।বন্যার বাবা গ্রামের বিচারক ধরনের মানুষ।তার মেয়েকে শাস্তি তো দূরে থাকুক বকা দেওয়ার মতো দুঃসাহস কোনো শিক্ষকের ছিলো না।বন্যার বক্তব্য টুকে রাখলাম।অল্প বয়সে কিছু কিছু ঘটনা মানুষের আমৃত্যু মনে থাকে।ঐ সময়ের বেশিরভাগ সৃতি আমার নিউরনের উপরিভাগে রয়ে গেছে।

পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে।আমি ফার্স্ট হয়েছি,এ নিয়ে কোনো ভালো লাগা কাজ করলো না।ধর্মের মতো একটা সাবজেক্টে বহুনির্বাচনিতে ৪০ এ ৩৮ পেয়েছি এ নিয়ে আক্ষেপের কোনো কমতি আমার ছিলো।
সেভেন এইটে ফার্স্ট হয়েই জেএসসিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পাশ করলাম।ফার্স্ট বয়ের তকমা নিয়ে সহপাঠীদের কাছে তখন আইডল হয়ে দাড়িয়েছি।সহানুভুতির স্টক তখন তুঙ্গে।
পরীক্ষার হলে আমার পাশে বসার সব রকম চেস্টা তখন সবার মধ্যেই বিরাজমান।

এই কয়েক বছর পাল্লা দিয়ে যে প্রতিবার দ্বিতীয় হয়েছে তার নাম যুঁথী।আমাকে পেছনে ফেলে প্রথম হওয়ার চেস্টায় কোনো কিছুর বাদ সে রাখেনি।শুধু ফার্স্ট হওয়াই সম্ভব হয়নি।এ নিয়ে কখনো তার মধ্যে হিংসা কিংবা ঈর্শা আমি দেখিনি।বরং তার ব্যাবহার অন্যান্য মেয়েদের চেয়ে ভিন্ন ছিলো।সেই ভিন্নতা বুঝে ওঠার বয়স আমার তখনো হয়নি।মেয়েরা অল্প বয়সেই অনেক বেশি বুঝতে শিখে যায়।

সময়টা ক্লাস এইটের মাঝামাঝি।বন্যার লিখা ৩পাতার এক সুদীর্ঘ প্রেম পত্র পেলাম।আমাকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসে থেকে শুরু করে আমাকে না পেলে বাঁচবে না ইত্যাদি কিছুই বাদ পরেনি সে চিঠিতে।এক সময় যেই মেয়ে চোর বলে অপবাদ দিয়েছিলো সেই মেয়ের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার মতো অবাক করা কারবার আর দ্বিতীয়টি হয় না।আমি অবাক হলাম না।

বন্যা দেখতে সুন্দর,তাছারা গ্রামের মাতবরের মেয়ের তকমা তো আছেই।এই মেয়ের প্রেমে রাজি হতে দেরি করার মতো বোকামি আর কিছুতেই হয় না।তাছাড়া জীবনের প্রথম প্রেম বলে কথা।এ সমস্ত গুনবাচক কথা ভাব্বার মতো ধৈর্য আমার হয়নি।ওই বয়সে যতোটা ঘৃণা আর তিক্ততার সাথে প্রত্যাক্ষান করা যায়,তার সর্বস্ব দিয়েই প্রত্যাক্ষান করেছিলাম।

দু বছর পরের কথা,এসএসসি দিচ্ছি।যুঁথী যথারীতি দ্বিতীয় হয়েই পরীক্ষা দিচ্ছে।ভাল বন্ধুত্য হয়েছে।কথাবার্তা হয়।চোখাচোখিও বোধহয় হয়েছিলো।পরীক্ষার সময় মেয়েরা সবচেয়ে কম সাজে।এসময় পরীক্ষার চাপে সাজগোজ ঢাকা পরে যায়।যুঁথীর ক্ষেত্রে ঘটেছে বিপরীত।সে আরো বেশি করে সাজছে।সেই সাজের এক চিমটিও আমার দৃষ্টির অগোচর থাকছে না।

পরীক্ষা শেষে নিয়ম করে এসে জিজ্ঞেস করছে,এই বাকী বলতো কেমন লাগছে?
ওহ নাম বলতে ভুলে গেলাম।আমার নাম বাকী জান্নাতুল বাকী।বাবা কি বুঝে এমন আজগুবে নাম রেখেছিলেন কে জানে?
স্কুল ড্রেসে,লাল লিপ্সটিক,লম্বা কানের দুল,কোমর উব্দি চুল।এখনো সেই সৌন্দর্যের বর্ণনা দেওয়া এবং সেই সময় তার প্রশংসা করার ভাষা আমার অজানা।

যুঁথীর এরকম প্রশ্নে,সাজ ভালো হয়নি এমন মুখ করে বলতাম হুম ভাল।
আমার এমন উত্তরে যুঁথীর মুখ কালো হয়ে যেতো।যেন এক জীবনে এমন মর্মান্তিক কথা কেও তাকে বলেনি। গোমরা মুখে যুঁথীকে দেখার লোভ সামলানো কঠিন ছিলো।
মেট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছি বয়স শক্ত হয়েছে,যুঁথীর এমন আচরনের গোপন অর্থ অল্প করে হলেও আচ করতে পারি।

এসএসসির রেজাল্ট পাব্লিস্ট হয়েছে,যুঁথী আমার চেয়ে ২৭ পয়েন্ট বেশি পেয়ে ফার্স্ট।আমি হয়েছি দ্বিতীয়।যুঁথীর এই রেজাল্টে সবাই হতভাগ।সবার ধারনা ছিলো আমিই ফার্স্ট হবো।ছেলেরা আয়োজন করে তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।যুঁথীর মুখ ভাবলেশহীন।আমি দূর থেকে তাদের দেখছি।যুঁথী এগিয়ে এসে, মায়া জড়ানো গলায় বললো তুই ফার্স্ট হলি না কেন?
ব্যাপারটা এরকম আমি ফার্স্ট হইনি এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ তার জীবনে, সে আশা করেনি।

এরকম কেন করলি?
আমি বললাম,কি রকম?
-জানিস না কি রকম?
-উহু
-তুই ফার্স্ট হলি না কেন?
-তুই ভাল পড়েছিস,ভাল পরীক্ষা দিয়েছিস তাই।
-মিথ্যে বলবি না তুই ইচ্ছে করে সেকেন্ড হয়েছিস না?

আমি বললাম না।ইচ্ছে করে হবো কেন?
যুঁথী বললো আমার চোখের দিকে তাকা,আমি তাই করলাম।চোখের কোনে জল যেন,গরে পরার অপেক্ষা।আমি যদি অস্বীকার করি যে,ইচ্ছে করে ফার্স্ট হইনি তাহলে, এক্ষুনি পানি গাল স্পর্শ করবে।যুঁথী আমার হাত ওর মাথায় রেখে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,বল ইচ্ছে করে সেকেন্ড হয়েছিস?
আমি বললাম,হু।
-কেন করলি এমন বল?
আমি জবাব দিলাম।যুঁথী আকুতি মাথা কন্ঠে বললো,ভালোবাসিস? ততক্ষনে চোখের জল গাল স্পর্শ করে মাটির তৃস্না মেটাতে ব্যাস্ত।

একই সময় ক্লাস রুম থেকে বন্যার কান্নার আওয়াজ শোনা গেলো।সে ৭ বিষয়ে ফেল করেছে।বিজনেস ইন্টার্নশিপের মতো বিষয়ে পেয়েছে সারে সতেরো।তার বাবা তাকে বোঝানোর আপ্রান চেস্টা করছে।সে বুঝ শোনার মেয়ে না।তার জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেলো।


গল্পঃভাঙা শৈশব।
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!