বৈধ ভালবাসা পর্ব ৭

 বৈধ ভালবাসা পর্ব ৭

১বছর আগে আফরান যখন সুইডেন থেকে দেশে ফিরে তখন জানতোই না তার জীবনে নতুন মোড় আসবে।এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই তার চোখ সায়নী কে খুঁজতে থাকে।বিদেশ থাকাকালীন সায়নী তার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি।সায়নী নিজের ফোন নাম্বার বদলে ফেলেছিলো আর ইন্টারনেট তো ব্যবহার-ই করতো না।একটা ভূলের জন্য সায়নী তার সাথে এমন করতে পারে জানা ছিলোনা তার।তবে আফরান বিদেশ গিয়ে,সায়নী থেকে দূরে গিয়ে অনুভব করতে পেরেছে সে ভালোবাসে সায়নীকে।

বৈধ ভালবাসা পর্ব ৭

 বৈধ ভালবাসা পর্ব ৭ 



বাবাকে দেখে আফরান বাবার কাছে গিয়েই জড়িয়ে ধরে তাকে।
-বাবা আমি চলে এসেছি।
-তাতো দেখতেই পাচ্ছি মাই বয়!কোনো অসুবিধে হয়নিতো?
-না বাবা।
বাবাকে ছেড়ে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আফরান বলে-
সায়নী আসেনি বাবা?
-তোর জন্য রান্না করতে ব্যস্ত সে।সেই ভোর সকালে উঠে রান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
চল এখন।বাসায় গিয়ে সায়নীর হাতের রান্না মজা করে খাবি।
সায়নী তার জন্য রান্না করছে!কতোদিন সে সায়নীর রান্না খায়নি।
কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে দেয় হাসির মা।অনেক পুরোনো কাজের লোক সে।
আফরান আশা করেছিলো সায়নীকে দেখবে কিন্তু সায়নী দরজা খুলেনি।হতাশ হয়ে হাসির মায়ের সাথে কথা বলে ভেতরের দিকে পা বাড়ায় সে।কয়েক পা এগিয়ে পেছনে ফিরে জিজ্ঞেস করে-
খালাম্মা সায়নী কই?
-আপা মনিতো রান্না সাইরা নিজের ঘরে গেছে।
-আচ্ছা বাবা লাগেজ নিয়ে ঢুকলে বলিও আমি সায়নীর সাথে দেখা করতে গিয়েছি।
গোসল মাত্রই সেরেছে সায়নী।হালকা গোলাপি রঙের একটি সুতির কামিজ পরেছে।
গামছা নিয়ে লম্বা চুলগুলো মুছছে সে।
এমন একটি দৃশ্য আসলেই মনোমুগ্ধকর।
আফরান দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে এক দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে।
সায়নী পেছনে ফিরতেই দেখতে পায় আফরানকে।তাড়াতাড়ি নিজের উড়না-টা বিছানা থেকে নিয়ে বুকের উপরে দিতে দিতে বলে-
কখন এলে??
ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আফরান বলে-
এতোদিন পর দেখা হয়েছে,কথা হচ্ছে আর তুমি শুধু জিজ্ঞেস করছো কখন এলে?
-আসলে এভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেতো আমি হঠাৎ,মানে আসলে...
-হাহাহা।
-কি?
-তুমি এতো নার্ভাস হচ্ছো কেনো সায়নী?
-ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকলে নার্ভাস হবোনা?
-সুন্দর লাগছে তোমায়।
আর কিছু বলতে চেয়েও বাবার ডাকে বলতে পারেনি আফরান।
-আরে এতো গল্প করলে হবে?আগে দুপুরের খাবার খেয়ে নে।দুটিতে মিলে পরে গল্প করিস।যা আফরান ফ্রেশ হয়ে নে আর সায়নী তুই ভাত রেডি কর।
দুপুর ২টা......
ডাইনিং টেবিলে বসে ভাত খাচ্ছে আফজাল খান, আফরান,সায়নী।
-উম্ম...এত্তো মজা!জানো বাবা প্রতিদিন আমি সায়নীর হাতের রান্না মিস করতাম।এখন আমি চলে এসেছি আর মিস হবেনা।
-হবে হবে।
-কেনো?
-আরে সায়নীর তো বিয়ে দিতে হবে তাইনা?
বাবার কথায় থমকে যায় আফরান।
সায়নীর বিয়ে!বললেই তো আর বিয়ে হয়ে যাচ্ছেনা।প্লেটে আঙুল নাড়াতে নাড়াতে আফরান বলে
-হুম বিয়েতো দিতে হবে।আগে রান্না মন ভরে খেয়ে নেই।
-আরে না সামনেই ওর বিয়ে।
-মানে?
-মানে সায়নীর বিয়ে পাবেলের সাথে।
-ওর ফুফাতো ভাই?
-হুম আগামী মাসেই তারা দেশে আসবে,এরপর দিন তারিখ ঠিক করে বিয়েটা হয়ে যাবে।
-ওহ।
খাবার টেবিলে আর কেউ কোনো কথা বলেনি।
দুপুরে সায়নীর রুমে যায় আফরান।সারা দিন কাজ করে সায়নী ঘুমোচ্ছিল বেহুঁশের মতো।
ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে দেখতে আরো বেশি সুন্দর লাগছিলো।কিন্তু আফরানের মনে অনেক প্রশ্ন যা না জানলে নিজেকে শান্ত থাকতে পারছেনা সে।
তাই সে সায়নীকে ডাকলো-
সায়নী এই সায়নী?
কোনো সাড়া না পেয়ে পাশের টেবিলে থাকা জগ থেকে পানি নিয়ে সায়নীর মুখে পানির ছিটকা দিতেই সায়নী উঠে বসে যায়।চরম ভয় পেয়েছে সে।তাই আফরান তার পাশে বসে হাত ধরে বলে-
এই সায়নী আমি আফরান।
সায়নী কিছুক্ষণ চুপ থেকে আফরানের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে-
এই অবেলায় তুমি?
-এতোদিন যোগাযোগ করোনি কেনো?ওই দিনের ঘটনার জন্য?যেদিন আমি তোমার...
-আফরান ভাইয়া ওসব কিছু না।তুমি যাওয়ার পর পরই খালু আমাকে জানিয়েছিলো আমার মা-বাবার ইচ্ছা,পাবেল কে যেনো আমি বিয়ে করি।
-হুম করবে।তাতে আমার সাথে যোগাযোগ না রাখার কি হলো?দেখো সায়নী সেদিন আমি ইচ্ছাকৃত কিছু করিনি।
-প্লিজ ভাইয়া বাদ দাও।
-আমাকে তুমি ক্ষমা করতে পারোনি তাই যোগাযোগ করোনি,নাম্বার বন্ধ করে দিয়েছো?কিন্তু একবার ভাবোনি আমার কষ্ট হবে এতে।
-কিসের কষ্ট?
-ছোট লাগে নিজেকে।এতোদিন কতোটা অপরাধবোধ কাজ করেছে নিজের মধ্যে তুমি বুঝবেনা।
-প্লিজ ভাইয়া...
-না বলতে দাও আমায়।আমি এতোই খারাপ যে তুমি আর কথাও বলোনি আমার সাথে,
এখনও দূরে দূরে থাকছো।এতোদিন হয়ে গিয়েছে ব্যাপারটা ভূলতে পারোনি তুমি।
-এসব কিছু নয়,আমি তোমার সাথে কথা বললে নিজেকে ঠিক রাখতে পারবোনা তাই কথা বলিনি।
-মানে?
-মানে খালু যখন বলেছেন তুমি যাওয়ার পর আমার সাথে পাবেলের বিয়েটা হোক এটা বড়দের ইচ্ছা ছিলো,তখনি আমি ঠিক করি তোমার সাথে আর যোগাযোগ রাখবোনা।
রাখলে কষ্ট হবে কারণ আমি তোমাকে...
সায়নী থেমে যায় আর কিছু না বলেই।
-কি সায়নী বলো?তুমি আমাকে?
কিছুনা বলেই সায়নী রুম থেকে বের হয়ে যায়।
সায়নীও আফরানকে ভালোবাসে।আগে সে এটা উপলব্ধি করতে না পারলেও আফরান দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পরে পেরেছে।
কিন্তু খালু তাকে তার মা-বাবার ইচ্ছার কথা বলেছেন তার পরে সে কি করে পারবে আফরানের দিকে নজর দিতে!আর আফরান,সেও তো ভালো কাউকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে পারে কেনো সে সায়নীর মতো মেয়েকে নিজের জীবনে ঠাই দিবে যে তাদের বাড়িতে আশ্রিতা!এসব ভেবেই সে আফরানের সাথে যোগাযোগ রাখেনি।
রাত ২টা....
আফরানের চোখে ঘুম নেই।সায়নীও তাকে ভালোবাসে!পুরো কথাটা না বললেও সায়নীর কথায় এটাই বুঝা যাচ্ছে।তার মানে তারা দুজন দুজনকে ভালোবাসে।মাঝখানে এই পাবেল-টা কেনো আসবে!নাহ যেভাবেই হোক একে সরাতে হবে।
দেখতে দেখতে ৮দিন কেটে যায়।
আফরানের বাবা সায়নী আর আফরান দুজনকেই ড্রয়িংরুমে ডেকে আনেন।
-পাবেলরা কিছুদিন পরই দেশে আসবে।সময় বেশি নিয়ে আসবেনা।সায়নীর সাথে ওর বিয়েটা আমি দিয়ে দিতে চাই।আফরান তোর কিন্তু দায়িত্ব অনেক।
-হুম বাবা।
-সায়নী মা?তোর কিছু বলার আছে?
-না খালু,বলার নেই।
সারাটা দিন অস্থিরতায় কাটে আফরানের।খানিকক্ষণ পায়চারী করে পকেট থেকে মোবাইল-টা বের করে ফোন দেয় তার বন্ধু হাবিব কে।
-হ্যালো হাবিব?
-হুম দোস্ত বল।
-তোকে একটা মেসেজ দিচ্ছি ওই ঠিকানায় আমাদের আরো কয়েকজন বন্ধুদের সাথে নিয়ে আসতে পারবি এখন?
-এখনি?
-হুম।
-আচ্ছা পারবো।কিন্তু কেইসটা কি?
-এলেই দেখবি।
সায়নীকে রুমে দেখতে না পেয়ে তার রুমের জিনিসপত্র ঘাটাঘাটি করতে থাকে আফরান।
অবশেষে পেয়ে যায় একটি ফাইল যাতে সায়নীর জন্মসনদ-সহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পায়।তাড়াতাড়ি ব্যাগের ভেতরে ঢুকিয়ে নেয় সেটি।
-তুমি এখানে?
-আমার মেয়ে বান্ধবী একটা খুব বিপদে পড়েছে।তোমাকে আমার সাথে যেতে হবে সায়নী প্লিজ।
-কি বিপদ?
-যেতে যেতেই বলবো চলো এখন।
গাড়ি বের করে সায়নীকে নিয়ে রওনা হয় আফরান।কিছুদূর গিয়ে রাস্তার পাড় থেকে তার বন্ধু হাবিবসহ কয়েকজন কে গাড়িতে তুলে নিয়ে সোজা চলে যায় কাজী অফিসের সামনে।গাড়ি থেকে নেমেই সায়নী প্রশ্ন করে
-কই তোমার বান্ধবী?
-সায়নী আজ আমরা বিয়ে করবো।
-আমরা মানে?
-তুমি আর আমি।
-মাথা ঠিক আছে তোমার!কেনো তোমাকে বিয়ে করবো আমি?
-কারণ তুমি আমাকে ভালোবাসো।বাসোনা?
সায়নীকে চুপ থাকতে দেখে আফরান বলে
-আমিও তোমাকে ভালোবাসি।
-কি?
-বললাম যে আমিও তোমাকে ভালোবাসি।
-সত্যি?
-একদম।
সায়নী বুঝে উঠতে পারছেনা এসব সত্যি নাকি!খানিকক্ষণ চুপ থেকে সে বলে
-কিন্তু পাবেলের...
-উফফ..ওই পাবেলের কথা তুমি চিন্তা করোনা।
-আর খালু?
-বাবা মেনে নিবে আমাদের।
-উনাকে না জানিয়ে?
-গিয়েই জানাবো।আগে বিয়েটা করে ফেলি।
উনি শুনলে হয়তো না মানতে পারেন।তুমি জানোই বাবা কাউকে কথা দিলে রাখেন।
তাই উনি চাইবেন পাবেলের সাথেই তোমার বিয়েটা হোক।এখন যদি আমরা বিয়ে করে নেই তাহলে বাবা মানতে বাধ্য।
-কিন্তু অনেক ফর্মালিটি থাকে বিয়ে করতে,আমিতো কিছুই আনিনি।
-আমি সব এনেছি।আমারো,তোমারো।
-আমার রুমে তুমি তখন এসব করছিলে?
-জ্বী ম্যাডাম,চলেন এবার বিয়েটা করেই ফেলি।
সেদিন আফরানের কথা সায়নী মেনে নেয়।
আফরান তাকে ভালোবাসে জেনে কোনটা ঠিক কোনটা ভূল কিছুই তার বোধগম্যে আসেনি।সে শুধুই তার ভালোবাসার মানুষের ডাকে সাই দিয়েছে।
আফরানের বন্ধুদের সাক্ষী করে বিয়ে করে নেয় তারা।
বাসায় ফিরে দুজনে এগিয়ে যায় আফজাল খানের রুমে।
-বাবা আসবো?
-হুম,কোথায় গিয়েছিলি তোরা?
-আমরা আসলে...
-যাকগে একটা কথা বলার ছিলো।
-কি?
-পাবেলরা আসতে পারছেনা দেশে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে।
-কখন আসবে?
-সেটাও সঠিক করে বলেনি।
-ওহ।
-যা তোরা,এ ব্যাপারে আর কিছু জানলে তোদের বলবো।
পাবেল দেশে আসছেনা!এই কথাটা শোনার পর আফজাল খানকে তারা আর কিছু বলেনি।চলে যায় যে যার রুমে।
রাত ২টা....
সায়নীর দরজায় কড়া নাড়ে আফরান।

written by Saji_Afroz
To Be Continue
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!