বৈধ সম্পর্ক - পর্ব ১৬

 বৈধ সম্পর্ক - পর্ব ১৬

বৈধ সম্পর্ক

বৈধ সম্পর্ক 


প্রাইভেট কারটি যখন সায়নীর খুব কাছাকাছি চলে আসে তাকে সরাতে গিয়ে কারটির সাথে ধাক্কা লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মুনিরা।সাথে সাথেই মুনিরার মাথা ফেটে পড়তে থাকে অজস্র ধারায় রক্ত।
ঘটনার আকষ্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যায় সায়নী।সে নিজে আত্নহত্যা করতে চায়নি।
কেনো যে সে রাস্তার মাঝখানটাই চলে গিয়েছিলো তার নিজেরি জানা নেই।
.
এদিকে আফরান ছুটে আসতেই দেখে সায়নী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিন্তু মুনিরা মাটিতে পড়ে আছে।
সায়নীকে সে ভালোবাসলেও মুনিরার এমন অবস্থা হোক কখনো সে চায়নি।
.
.
-ডাক্তার মুনিরার কি অবস্থা?
-উনি আপনার কি হন?
ডাক্তারের করা প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আফরান বলে-
আমার স্ত্রী।
-আচ্ছা।মাথায় আঘাত পেয়েছে।হাতেও সামান্য আঘাত পেয়েছে।তবে ভয়ের কিছু নেই।
-জ্ঞান ফিরেছে?
-না,আপনারা আজ রাত উনাকে এখানে রাখলে ভালো হয়।
-ঠিক আছে।
.


ডাক্তারের কথায় যেনো শরীরে প্রাণ ফিরে পায় আফরান।মুনিরার কিছু হলে নিজেকে সে কখনো ক্ষমা করতে পারতোনা।
.
ঘটনার পর থেকেই সায়নী চুপচাপ হয়ে যায়।
এমন পাগলামি না করলে মুনিরাকে হয়তো বিপদে পড়তে হতোনা।আর মুনিরা!কোন মাটি দিয়ে তৈরি সে!এতো কিছু জানার পরেও প্রথমে আফরানের সাথে থাকতে চেয়েছে তাকে ভালোবাসে বলে।আবার নিজের জীবনের পরোয়া না করে তাকে বাঁচিয়েছে।
মুনিরার জায়গায় সে নিজে থাকলে কি করতো!মরেই যেতে দিতে হয়তো।
-সায়নী?
আফরানের ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বের হয় সায়নী।
আফরানকে দেখেই সায়নী বলে উঠে-
মুনিরা কেমন আছে?
-ভয়ের কিছু নেই বলেছে ডাক্তার।
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে সায়নী।
হাসপাতালের করিডোরে রাখা একটি বেঞ্চে বসে ছিলো সে।আফরান তার পাশে বসে ডান হাতটি ধরে বলে-
এ কি!এতো গরম কেনো তোমার শরীর!
সে কথার জবাব না দিয়ে সায়নী বলে-
-আজ যদি মুনিরার কিছু হয়ে যেতো!
-নিজেকে দোষারোপ করছো মনে মনে?
-হুম।
-আসলেই তোমার দোষ।আজ যদি মুনিরা তোমাকে না সরাতো কি হতো?এইরকম পাগলামো কেউ করে!
-তোমার ভাগ কাউকে দিতে পারতাম না আমি।
-আমি কি বলেছিলাম দিতে?
-না।
-দিতে হবেনা কাউকে।
-কিন্তু আমি দিতে চাই।
-মানে?
-মুনিরাকে তুমি ডির্ভোস দিবেনা।
-সায়নী আমি তোমার কথা কিছু বুঝছিনা।
-মুনিরাও তোমার বউ হিসেবে থাকবে।ওতো সব জানার পরেও থাকতে চেয়েছে।
-কিন্তু আমিতো তোমাকে ভালোবাসি।
-মুনিরাকেও বাসবে।
-এসব কি বলছো তুমি!
-কেনো?এমন কি হয়না!সামর্থ্য থাকলে একাধিক বউ রাখা যায়।
-কিন্তু ভালোবাসা যায়না।
-এটা ভূল ধারণা।আস্তে আস্তে একসাথে থাকতে থাকতে ভালোবাসাটাও তৈরী হবে।
-আবেগ নিয়ে এসব বলছো তুমি সায়নী।
বাদ দাও এসব এখন।
-কি করে বাদ দিবো!ওই মেয়েটা আমার জন্য মরতেও ভয় করেনি।আর বলতে গেলে শুধু আমার জন্য নয়।তোমার ভালোবাসাকে বাঁচাতেও।
-আমরা দেখেশুনে ভালো জায়গায় না হয় বিয়ে দিবো ওর।
-যতটা সহজ ভাবছো ততটা সহজ নয়।একটা ডির্ভোসী মেয়ের স্থান সমাজের কোন পর্যায়ে থাকে তুমি জানো!একবার বিয়ে ভেঙেছে আর এখন তুমিও যদি ছেড়ে দাও সবাই কোন চোখে দেখবে ওকে বুঝতে পারছো?
-ওর সাথে আমার শারীরিক কিছু হয়নি।
-সেটা তুমি,আমি আর ও ছাড়া কেউ জানেনা।
-তাই বলে....
-আজ ওর কিছু হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না আফরান।আমি এতোটা স্বার্থপর যে কোনোদিন ওর কথা ভাবিনি।দুঃখী মেয়েটার পরিণতি কি হবে চিন্তা করিনি,শুধু নিজের চিন্তায় মজে ছিলাম।ডির্ভোসের পর তার কি হবে তাও ভাবিনি।তুমি বলো আমাদের ভূলের মাশুল ও দিচ্ছেনা আজ?
-সায়নী প্লিজ শান্ত হও।
-আমি চাইলে ওকে সবটা শুরুতেই জানাতে পারতাম।কিন্তু বলিনি।ওর যে একটা মন থাকতে পারে সেটা ভাবিনি।একটা আঘাত না সারতেই আরেকটা আঘাত দিতে তৈরি ছিলাম।আফরান আমি আসলেই খারাপ।
-ভূলতো মানুষ করে সায়নী।তাই বলে...
-আমার মনের সব হিংসে চলে গিয়েছে।
মুনিরা যদি পারে আমিও কেনো পারবোনা!আমি না হয় তোমার গোপন বউ-ই থাকবো।
.
আফরান খেয়াল করে সায়নী হাপিয়ে উঠেছে।
কথা বলার সময় সে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে।
সায়নীর মাথা নিজের বুকে নিয়ে বলে সে-
এসব দেখা যাবে।এতো চিন্তা করোনা।
-হু।
-এখন চলো তোমাকে ডাক্তার দেখায়।অনেক দূর্বল দেখাচ্ছে তোমাকে।
-পরে....
-কোনো পরে টরে না,অনেক অবহেলা হয়েছে চলো এখন।
-হুম।
.
.
বসা থেকে উঠতেই দেখা পায় তারা মিশিকার।
-সায়নী তুই এখানে?
-হুম,মুনিরার জন্য।
-কেনো?
-এক্সিডেন্ট করেছে সে।
-কি বলিস!এখন ঠিক আছে সে?
-ডাক্তার বলেছেন ভয়ের কিছু নেই।
-তোর এই অবস্থা কেনো?চোখের নিচে কালি,মুখ ফ্যাকাসে,মনে হচ্ছে এখুনি পড়ে যাবি।
কথাটি শুনে আফরান বলে উঠে-
পড়েতো কয়েকবার গিয়েছিলো।বুমিও করেছে অনেকবার।এখন দেখি শরীর টাও গরম।
তাই তোমার বান্ধবীকে ডাক্তার দেখাতে বলছিলাম।
-আরে আফরান ভাই আমাকে বললে আমি দেখে আসতাম বাসায় গিয়েই।
-হুম ভূল হয়ে গিয়েছে।
সায়নীর দিকে তাকিয়ে মিশিকা বলে-
মাথা কি ব্যথা করে তোর?
-হুম।
-এখন যখন এসেই পড়েছিস কিছু টেস্ট আর সিটি স্ক্যান করিয়ে নে।
আফরান বলে উঠে-
-তুমি ডাক্তার,যা বুঝো করো।
-ঠিক আছে।চলো আমার সাথে।
মিশিকার সাথে যেতে যেতে আফরানকে সায়নী বলে-
খালুর সাথে কে আছেন?
-হাসির মা আর তার স্বামীকে বলেছি থাকতে।
-আমাদের কি থাকতে হবে আজ?
-একরাত থাকলে ভালো হয় আর কি।মুনিরার অবস্থা স্বাভাবিক হয় কিনা...
-বুঝেছি।ঠিক আছে।
.
.
পরেরদিন দুপুরে....
মুনিরাকে নিয়ে বাসায় ফিরে সায়নী আর আফরান।মুনিরার মাথায় ব্যান্ডেজ করা হয়েছে।
.
.
বাসায় ফিরেই মুনিরা দেখা করতে যায় আফজাল খানের সাথে-
বাবা আসবো?
-আসো মা।
মুনিরা তার পাশে গিয়ে বসতেই তিনি বলে উঠেন-
কি করে হলো এসব?
-আমার অসাবধানতার জন্য।
-বাইরে কেনো গিয়েছিলে?
মুনিরা হঠাৎ তার এমন প্রশ্নে জবাব দিতে পারেনি।
মুনিরাকে চুপ থাকতে দেখে আফজাল খান বলেন-
তোমার আম্মাদের খবর দিবো?
-জ্বী না,দুশ্চিন্তা করবেন তারা।তেমন কিছু হয়নি আমার।
-ঠিক আছে।যাও এখন আরাম করো।
.
আফজাল খানের রুম থেকে বের হয়ে মুনিরা আফরানের পাশের রুমে গিয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলো।
সেই সময় দরজায় এসে সায়নী বলে-
আসবো মুনিরা?
শোয়া থেকে বিছানায় বসতে বসতে মুনিরা বলে-
আপু আসো।
মুনিরার পাশে বসে সায়নী বলে-
তুমি শোয়া থেকে উঠতে গেলে কেনো!
-সমস্যা নেই আপু।
-হুম।
-আমি দুঃখিত আপু।
-কেনো?
-তোমাদের মাঝে আসতে চেয়েছিলাম।অথচ তোমার দিকটা আমি ভাবিনি।তুমি কি করে নিজের স্বামীকে অন্য একটা মেয়ের সাথে দেখতে এতোদিন!আর আমি যখন সবটা জানলাম বেহায়ার মতো বললাম আমাকেও রাখো তোমাদের সাথে।আমার কারণে তুমি রাগ করে বেড়িয়ে পড়েছিলে।একটা বড় বিপদ হতে পারতো।
-তুমি হতে দাওনিতো।
-যদি হতো আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না।আমি চলে যাবো আপু।ডির্ভোস পেপারটা দিও,সই করে দিবো।
-তুমি চলে গেলে যে আমিও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবোনা।
-মানে?
-আমি চাইনা তুমি এই বাড়ি ছেড়ে যাও।সবার চোখে যেমন তুমি বউ ছিলে,তেমনি থাকবে।
আমি না হয় আফরানের গোপন বউ হিসেবেই থাকবো।
-আপু!
-তুমি যদি নিজের স্বামীর ভাগ দিতে পারো আমি কেনো নয়!
মৃদুু হেসে মুনিরা বলে-
তা হয়না আপু।
-কেনো হয়না?
-তুমি কষ্ট পাবে।
-বিশ্বাস করো আমার মনে কোনো হিংসে নেই আর।
-শুধু তা নয়।উনি আমাকে ভালোবাসেনা।
কিসের জোরে থাকবো আমি বলতে পারো?
-বৈধ সম্পর্কের জোরে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুনিরা বলে-
সম্ভব না আপু।বাবাকে এবার সব জানিয়ে দাও।উনি নিশ্চয় মেনে নিবেন।তোমার টাও বৈধ সম্পর্ক,তুমি কেনো গোপন বউ হয়ে থাকবে!
-কিন্তু...
-আমাকে আর এই বিষয়ে কিছু বলোনা আপু।পেপারটা দিও।আমি থাকতে চাইনা এখানে।চলে যেতে চাই।প্লিজ আর বলোনা এসব।
.
সায়নী আর কথা না বাড়িয়ে চলে যায় মুনিরার রুম থেকে।
.
.
রাত ৮টা...
কলিং বেল এর শব্দ হতেই সায়নী এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখতে পায় মিশিকাকে।
-আরে মিশি তুই এই সময়ে!ভেতরে আয়।
-ভেতরে ঢুকার আগেই মিশিকা জিজ্ঞেস করে-
আফরান ভাই কোথায়?
-আমাকে ফেলে আফরানকে কেনো!পাবেল কে বাদ দিয়ে এখন কি তোর আফরানের প্রতি...
-ধ্যাত ঢুকতে তো দিবি!
-আরে মজা করছিলাম।ভেতরে আয় আমি আফরান কে ডেকে দিচ্ছি।
.
.
আফরানকে নিয়ে সায়নী ড্রয়িংরুমে আসতেই মিশিকা বলে উঠে-
আজ কিন্তু আমি রাতের খাবার এখানে খাবো।
মুচকি হেসে সায়নী বলে-
তুই না বললেও না খেয়ে যেতে দিতাম না।
-তাহলে যা এখন।রান্না শুরু করে দে।তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে আমাকে।
-আজ এখানে থেকে গেলেই পারিস।
-নারে,আরেকদিন আসবো।
-আচ্ছা,ঠিক আছে।
সায়নী রান্নাঘরের দিকে এগুতে থাকে।
আর আফরান সোফায় বসতে বসতে বলে-
মিশিকা আমি তোমাকে এমনিতেই ফোন দিবো ভাবছিলাম।সায়নীর রির্পোটের জন্য।
-আমি ওটা নিয়েই এসেছি।
-তাই নাকি!দাও দেখি।
-দেখলে সহ্য করতে পারবেতো?
-বুঝলাম না মিশিকা।
ছলছল চোখে আফরানের দিকে তাকিয়ে মিশিকা বলে-
সায়নীর ব্রেইন টিউমার হয়েছে।
মিশিকার মুখে এমন একটা কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায় আফরান।
মিশিকা ব্যাগ থেকে রির্পোট-টা বের করে আফরানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে-
ভেঙ্গে পড়োনা।শক্ত থাকতে হবে।তুমি ভেঙ্গে পড়লে সায়নীর কি হবে বলো!
.
আফরানের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছেনা।শুধু চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে।
আফরানকে চুপ থাকতে দেখে মিশিকা আবার বলে-
সায়নীর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করো।খুব বেশি দেরী হয়নি।
চোখ দুটো মুছে মিশিকার দিকে তাকিয়ে আফরান বলে-
ঠিক হয়ে যাবেতো সায়নী?
-হুম।
-গ্যারান্টি নেই?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মিশিকা বলে-
আর দেরী করা ঠিক হবেনা।
-তুমি আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছো মিশিকা।
তার মানে গ্যারান্টি নেই।
-আল্লাহ্‌ এর রহমত আর উন্নত চিকিৎসা পেলে সায়নী ঠিক হয়ে যাবে।আর ঠিক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
-আমি ওকে নিয়ে কোনো রিক্স নিতে চাইনা।দেশের বাইরে ওর চিকিৎসা করাতে চাই।কোন দেশে নিয়ে গেলে ভালো হবে?
-সিঙ্গাপুর নিয়ে যেতে পারো।
-ঠিক আছে।
রাত ১১টা......
রাতের খাবার খেয়ে ড্রয়িংরুমে আফরানের পাশে বসে টিভি দেখছে সায়নী।কিন্তু ছলছল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে আফরান।
-এভাবে হা করে কি দেখছো?
-তোমাকে।
-আমাকে হা করে দেখার কি আছে?
-তুমি বুঝবেনা।
-ঠিক আছে।মিশিকা কি বলেছে তোমাকে?রির্পোট এনেছে আমার?
.
চলবে.....

পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!