বন্ধুত্ব থেকে জীবনসঙ্গী


বন্ধুত্ব থেকে জীবনসঙ্গী
বন্ধুত্ব থেকে জীবনসঙ্গী
বন্ধুত্ব থেকে জীবনসঙ্গী

সেই কখন থেকে আমার বোন মেঘলা টাকার জন্য কানের
কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে। মাথার নিচ থেকে বালিশটা
কানে চেপে ধরলাম কিন্তু শয়তান বোনটা বালিশটা
নিয়ে গেলো। এই মেঘলাটার জন্য আমার সকালের ঘুম
হারাম হয়ে যায়। প্রতিদিন সকালে কিছু না কিছু নিয়ে
আমার কাছে আসবে আর ঘুমটাকে হারাম করে দিবে।
আজকে আসছে টাকার জন্য আরে বাবা আমি কি চাকরী
করি। চাকরি করলে সমস্যা ছিলো না। আমি বাবার কাছ
থেকে চেয়ে চেয়ে নেই আর উনি আসছে আমার কাছে।
আমি বললামঃ বোনরে বাবার কাছে গিয়ে বল উনি
নিশ্চয় দিবে। কে শুনে কার কথা মাঝখানে আমার ঘুমের
বারোটা বাজিয়ে দিলো। অনেক রাত করে ঘুমিয়েছি
ঘুমটাও হলো না এই মেয়েটার জন্য। আমি মেঘলার
কোনো কথা না শুনে জোরে জোরে আম্মুকে ডাক
দিলামঃ আম্মু দেখো তোমার মেয়ে আমার কাছে টাকা
চাইতে আসছে। দুই মিনিট পর আম্মু রুমে এসে বললোঃ কি
হইছে গণ্ডারের মত চিল্লাচিল্লি করতেছিস কেন? আমি
অনেকটা অবাক হয়ে বললামঃ ধুর বাবা নিজের ছেলেকে
গণ্ডার উপাধি দিলো। গণ্ডার বলছে তো কি হইছে
নিজেকে শক্ত করতে হবে তা নাহলে আজকে আমার
মানিব্যাগ শেষ হয়ে যাবে। আর কোনোকিছু ভাবাভাবি
না করে বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হতে চললাম আম্মু কান ধরে
এনে বললোঃ মেঘলার টাকাটা দিয়ে তারপর ফ্রেশ হতে
যান। আমি কাঁদোকাঁদো ভাবে বললামঃ আম্মু আগে কান
ছাড়ো তারপর দিচ্ছি। পাশে দাঁড়ানো আমার বোন
মেঘলা আমার অবস্থা দেখে খিলখিল করে হাসছে। আমি
চোখটা বড় করে মা যাতে না শুনে সেইভাবে বললামঃ চুপ
থাক শয়তান। আমার চোখ দেখে মেঘলা মায়ের কাছে
কাঁদোকাঁদো গলায় বললোঃ আম্মু দেখছো তোমার ছেলে
আমাকে ধমকি দিচ্ছে। আমি একটু সামনে গিয়ে মেঘলার
মাথায় হাত দিয়ে বললামঃ ধুর মেঘলা আমি কি তোকে
ধমক দিতে পারি। আমার মুখে হাসি আসছে না তারপরও
একটু অভিনয় করে হাসি দিয়ে বললামঃ আচ্ছা তোর কত
টাকা লাগবে?
ঝটপট মেঘলা বলে দিলোঃ পাঁচশত টাকা লাগবে।
মেঘলার কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমি
অনেক ভেবেচিন্তে আম্মুকে বললামঃ আম্মু তোমাকে
মনে হয় বাবা ডাকতেছে তুমি যাও আমি মেঘলাকে
টাকাটা দিয়ে দিবো। আম্মুর কাছে আমি বরাবরই ধরা
খেয়ে যাই টাকা না দিয়ে আমাকে আজ ছাড়বে এইটা
আমি বুঝে গেছি। কি আর করা মানিব্যাগ খুলে দেখি ৫২০
টাকা। কাল রাতে বাবার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিলাম
এখন আবার কি করে টাকা চাই। যাই হোক টাকাটা
মেঘলাকে দিয়ে দিবো। টাকাটা অর্ধেক মেঘলার হাতে
আর অর্ধেক আমার হাতে কিছুতেই ছাড়তে ইচ্ছে করতেছে
না। মেঘলা বললোঃ ভাইয়া টাকাটা ছাড় না আমার
দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি ছেড়ে দিলাম আর উনি নিয়ে
গেলো। আম্মু আর মেঘলা রুম থেকে হাসতে হাসতে বের
হয়ে গেলো। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি আদিবার ৭ টা মিসড
কল। মোবাইল সাইলেন্ট করা ছিলো আর উনি তো ভাববে
ইচ্ছে করে ধরিনি। আদিবা হলো আমার বেষ্ট বান্ধবী।
তাকে ছাড়া আমার দিন যায় না। আমাকে ছাড়াও
আদিবার দিন যায় না। বেকার ছেলেদের কপালে সুখ নাই
মনে মনে বলতে বলতে রুম থেকে বের হইলাম। তারপর
আম্মুর উদ্দেশ্যে বললামঃ আমাকে কি কেউ
খাবারদাবার দিবে? প্রথম অবস্থায় কোনো সাড়াশব্দ
আসলো না তাই আবার বললামঃ আমাকে কি কেউ চারটে
ভাত দিবে। আম্মু রুম থেকে এসে বললোঃ আমার হাতে
আর কত খাবি এবার অন্যকিছু চিন্তা কর। আমি অসহায়ের
মত বললামঃ আজ বউ নাই বলে। আম্মু মুখে হাত দিয়ে
হাসতে লাগলো। খাওয়ার মাঝখানে ফোনটা কেঁপে
উঠলো। আদিবার ফোন, হাত ধুয়ে ফেললাম। আম্মু অবাক
হয়ে বললোঃ হাত ধুয়ে ফেললি কেন? আমার তাড়া আছে
আমি গেলাম। এই বলে আমি বাসা থেকে বের হইলাম
উদ্দেশ্য আদিবার কাছে যাওয়া। মিনিট ১০ মিনিট পর
আদিবার কাছে গেলাম। গিয়ে দেখলাম মেয়েটা গাল
ফুলিয়ে বসে আছে। আমি আস্তে আস্তে বললামঃ
অনেক্ষণ ধরে বসিয়ে রাখার জন্য সরি। আমার কোনো
কথার উত্তর দিচ্ছে না আদিবা। তারপর কান ধরে
বললামঃ এইবার দেখ কান ধরছি। আদিবা একটু মুচকি
হাসিয়ে দিয়ে কান থেকে আমার হাতটা সরিয়ে তার
পাশে বসালো। অনেক্ষণ চুপ থাকার পর আদিবা বললোঃ
তা আপনার এত দেরি হওয়ার কারণ কি? আমি মনটা
খারাপ করে বললামঃ ঘরে যদি ছোট বোন থাকে তাহলে
দেরি হবেই। আমার কথা শুনে আদিবা হাসতে শুরু করলো।
আমি বললামঃ পুরো ঘটনাটা আগে শোন তারপর হাসিস।
অনেকদিন পর কাল রাতে ফেইসবুকে ঢুকলাম গিয়ে দেখি
একটা অচেনা মেয়ের মেসেজ। তারপর রিপ্লে দিলাম
এইভাবে কথা বলতে বলতে রাত ৩ টা বেজে গেছে তারপর
সকাল সকাল এসে আমার শয়তান বোনটা ঘুমকে হারাম
করে দিলো। বায়না ধরলো পাঁচশত টাকা দিতে হবে এই
হলো ঘটনা। আদিবা চুপ করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।
আদিবার চুপ থাকা দেখে কিছুই বুঝলাম না বললামঃ কি
রে চুপচাপ কেন? তাও আবার অন্যদিকে তাকিয়ে?
কোনো কথার উত্তর দিলো আদিবা। আমি বললামঃ
এদিকে তাকা বলছি প্রথম অবস্থায় না তাকালেও
দ্বিতীয় বার বলার পর তাকালো। আদিবা তাকাতেই
আমি অনেকটা অবাক হইলাম। নিজের কাছে নিজেই
প্রশ্ন করলাম আদিবা কাঁদছে কেন?? তারপর আদিবা
কোনো কথা না বলে আমার গলা চেপে ধরলো আর
বললোঃ তুই মেয়েদের সাথে চ্যাট করিস কেন?? আমি
বললামঃ তাতে তোর কি? আদিবা আমার গলায় আরো
জোরে চেপে ধরলো। আমি আর না পেরে বললামঃ আচ্ছা
ঠিক আছে আর কোনো মেয়ের সাথে চ্যাট করবো না
এইবার তো গলা থেকে হাতটা সরা। আমি কাশতে
কাশতে বললামঃ আরেকটু হলে তো মরেই যেতাম। তুই অন্য
অচেনা মেয়ের সাথে কথা বলবি কেন? যদি তোরে নিয়ে
যায়। আমি হো হো হো করে হেসে বললামঃ তুই আসলেই
একটা পাগলী। তারপর থেকে ও আমাকে কোনো মেয়ের
সাথে দেখলে আমার উপর অনেক রাগ করে প্রয়োজন হলে
ধমক দেয়। বাসা থেকে বের হয় না। ফোন অফ করে দেয়।
আদিবার এসব পাগলামো দেখে একদিন আমিও তার
প্রেমে পড়ে যাই। মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে
আদিবা কি আমাকে ভালোবাসে নাকি শুধুই পাগলামি?
আমি দুটানায় পড়ে গেলাম তাই সাহস করে কোনোদিন
বলতে পারিনি কারণ যদি ভুল বুঝে। আদিবা কি আমাকে
সত্যি সত্যি ভালোবাসে নাকি শুধু বন্ধু ভাবে। তারপর
একদিন আমি অভিনয় করে বললামঃ আদিবা বাসা থেকে
আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলছে। মেয়েটা ইন্টার ফার্স্ট
ইয়ার বলতে পারলাম না তার আগেই আমার পাশ থেকে
উঠে চলে যেতে লাগলো। আমি একটু দৌড়ে গিয়ে হাতটা
ধরলাম। আদিবার আমার দিকে ফিরতেই দেখলাম রাগে
চোখমুখ লাল হয়ে গেছে আবার কাঁদছেও আমি হাসতে
হাসতে বললামঃ পাগলী এতক্ষণ আমি যা বলছি সবটুকু
ছিলো অভিনয়। দেখলাম তুই আমাকে ভালোবাসিস কি
না। তারপর আদিবা আরো রেগে তেলে বেগুনে জ্বলে
উঠলো আর বললোঃ এসব নিয়ে অভিনয় করলি কেন কুত্তা?
বলতে বলতে আমায় জড়িয়ে ধরে বাচ্চা পোলাপানের মত
কাঁদতে লাগলো। আমি বোকার মত হা করে এদিক ওদিক
তাকিয়ে রইলাম আর দেখলাম কেউ দেখছে কি না।
আশেপাশে তো কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। তারপর
আমিও আদিবাকে জড়িয়ে ধরে বললাম আমি তোকে
অনেক অনেক ভালোবাসি।
.
আমার আর আদিবার ফ্যামিলির ওরা জানে আমরা
দুজনেই শুধু বন্ধু তাছাড়া আর কিচ্ছু না। কিন্তু কখন যে দুজন
দুজনকে ভালোবেসে ফেলছি জানি না। আমার প্রতি
আদিবার ভালোবাসা দেখে আমিও তাকে ভালোবেসে
ফেলছি। আমি বুঝে গেছি আমার লাইফে এমন একজনকে
দরকার। আর সেটা হলো আদিবা। মেয়েরা যাকে একবার
সত্যিকারে ভালোবাসে তাকে ছাড়া জীবনে আর
কাউকে ভাবতেই পারে না। জীবন সঙ্গী করলে একমাত্র
তাকেই করবে।
.
এইভাবে আমার আদিবার সম্পর্ক আরো গভীর হতে
লাগলো। একটা সময় আদিবার ফ্যামিলি থেকে
আদিবাকে জোর করে বিয়ে দিতে চাইলো কিন্তু আদিবা
তো আমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না। একদিন
আদিবা আমাকে ফোন দিয়ে কাঁদোকাঁদো স্বরে বললোঃ
জাহিদ আমি তোকে ছাড়া আমার জীবনে আর কাউকে
জায়গা দিতে পারবো না। প্লিজ তাড়াতাড়ি কিছু একটা
কর। আদিবার কথা শুনে আমার চোখেমুখে অন্ধকার
দেখছি। বেশ অসহায়ের মত বললামঃ তুই কোনো চিন্তা
করিস না আমি দেখতেছি। এইভাবে দেখতে দেখতে
আরো ৩ দিন কেটে গেলো। কোনো ব্যবস্থা করতে
পারলাম না। একদিন রাতে আমি আর মেঘলা ফাজলামো
করছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে আদিবা আমার সামনে কাপড়
গুছানো ব্যাগ নিয়ে উপস্থিত। আদিবাকে দেখে বুঝা
যাচ্ছে মেয়েটা মা-বাবাকে ছেড়ে একেবারে আমার
কাছে চলে আসছে। এখন যদি আমি ফিরিয়ে দেই তাহলে
তার একটাই পথ থাকবে আত্মহত্যা। আমি সবকিছু
বিবেচনা করে দেখলাম বিষয়টা আমার মা-বাবাকে
জানানো উচিত। তাই আদিবাকে নিয়ে মা-বাবার সামনে
গেলাম। গিয়ে সবকিছু বুঝলাম। আর সন্তানের কথা মা-
বাবা কখনো ফেলবে না এই আশ্বাস নিয়ে আসছি। প্রথমে
মা-বাবা একটু আশ্চর্য হলেও পরে সব ঠিকঠাক। কাল
সকালে মা-বাবা গিয়ে আদিবার মা-বাবার সাথে কথা
বলবে।
.
সকালে মা-বাবা গিয়ে আদিবার পরিবারের সাথে কথা
বললো। প্রথমে রাজি না হলেও পরে অবশ্য রাজি হয়ে
যায়। আজকে যদি আমি আমার মা-বাবার কাছে না
গিয়ে আদিবাকে নিয়ে পালিয়ে যেতাম তাহলে দুই
পরিবারের মানসম্মান মাটির সাথে মিশে যেতো। এতে
হয়তো আমার মা-বাবা হার্ট এট্যাক না করলেও আদিবার
পরিবারের কেউ করতো। ছেলেমেয়ে পালিয়ে গেলে
ছেলের চাইতে মেয়ের বাবার মানসম্মান বেশি যায়।
এরকম ভুল অনেকেই করে। কমপক্ষে একবার হলেও মা-
বাবাকে জানানো উচিত তারা যদি না মেনে নেয়
তাহলে যেতে পারেন। মা-বাবা কখনো সন্তানের কথা
ফেলবেন না।

পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!