বৈধ সম্পর্ক - সিজন দুই | সাজি আফরোজ (পর্ব ৬)

 বৈধ সম্পর্ক - সিজন দুই | সাজি আফরোজ (পর্ব ৬)

বৈধ সম্পর্ক - সিজন দুই

বৈধ সম্পর্ক - সিজন দুই  



১১দিন কেটে গেলো.....
মুনিরাকে দেয়া কথা রাখার চেষ্টা চালু থাকলেও সায়নীর সাথে বেশি সময় কাটাতে হয় আফরানের। কেননা গর্ভবতী কালীন মেয়েদের মেজাজ কারণে অকারণে খারাপ হয়। সায়নীরও এর ব্যতিক্রম হচ্ছেনা। হুট করেই মেজাজ বিগড়ে যায় আবার হুট করে ভালোও হয়ে যায়।
বাসার সকলে সায়নীর দিকে বিশেষ মনোযোগ রাখছে।
তবে ইদানীং সায়নী নিজের রুমেই দিনের বেশিরভাগ সময় কাটায়। মুনিরার সাথে আগের মতো বসে গল্পও করেনা।
হয়তো মুনিরার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে তাই।
.
অফিস থেকে এলো আফরান। হাসির মা দরজা খুলে দিতেই সে সোজা চলে গেলো মুনিরার রুমে।
-এ কি আপনি!
-হু। পড়ছো?
-হ্যাঁ।
-তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।
-কি?
.
মুনিরার দিকে একটি প্যাকেট বাড়িয়ে দিলো আফরান।
মুনিরা খুলে তাতে একটি লাল রঙের জামদানি শাড়ি দেখতে পেলো।
উৎফুল্ল দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুনিরা বললো-
অনেক বেশি সুন্দর!
-সত্যি?
.
আফরানের কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে মুনিরা বললো-
হু সত্যি।
.
.
.
আফরান এসেছে প্রায় ১৫মিনিটের বেশি হচ্ছে। এখনো সায়নীর রুমে আসছেনা কেনো! এমন টা তো হয়না। প্রতিবার সায়নীর কাছেই আগে আসে সে।
রুমের মাঝে পায়চারী করতে করতে আফরানের অপেক্ষা করছে সায়নী।
এরইমাঝে আগমন ঘটলো আফরানের।
সায়নীকে দেখতে পেয়ে সে বললো-
আমার রানীটা কে অস্থির অস্থির মনে হচ্ছে যে?
-এতক্ষণ কোথায় ছিলে?
-মুনিরা ও বাবার সাথে দেখা করে এসেছি।
-ওহ!
.
আফরান তার হাতে থাকা প্যাকেট থেকে গোলাপি রঙের একটি জামদানি শাড়ি বের করে এগিয়ে দিলো সায়নীর দিকে।
সায়নী বললো-
আমার জন্য এটা?
-তোমার দিকে বাড়ালাম মানে তোমারই।
-সুন্দর। মুনিরাকে দিয়েছো?
-হুম।
-এমনি?
-না৷ লাল রঙের।
-কেনো?
.
বিছানার উপর বসতে বসতে আফরান বললো-
কেনো মানে? যে যেমন রঙ পছন্দ করে তাকে তেমনি দিলাম।
-আজকাল দেখছি অনেক কিছুরই খেয়াল রাখো তুমি।
-মানে?
-আগে তুমি আমার কাছেই আসতে আজ হলো এর বিপরীত। কেনো?
.
সায়নী কি ইঙ্গিত করছে বুঝতে পারলো আফরান।
মৃদু হেসে সে বললো-
তোমার সাথে তো আমি থাকবই। তাই তো ওদের সাথে দেখা করে এলাম।
-মুনিরার সাথে থাকো গিয়ে। আমি কিছু বলবো না।
.
আফরান সায়নীর পাশে এসে তার দুগালে হাত দিয়ে বললো-
কি হয়েছে সায়নী তোমার বলো তো? মনে কি চলছে তোমার? আমাকে বলো?
.
এ কি করছে সে! সে এটা করতে পারেনা। সে সুস্থ হয়েছে তার সন্তান আসতে চলেছে বলে মুনিরাকে দেয়া কথা সে ফেলতে পারেনা৷ ভুলতে পারেনা মুনিরার জন্যই সমাজে স্বীকৃতি পেয়েছে সে।
নিজেকে সামলে নিয়ে আফরানের বুকে মাথা রেখে সায়নী বললো-
কিছুনা। মিস করছিলাম তোমাকে।
.
আফরানও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সায়নীকে।
ডাক্তার বলেছে এই সময়ে মুড সুইং হয় যখন তখন। এসব মানিয়ে চলতে হবে।
.
.
হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ হতেই আফরানের উদ্দেশ্যে সায়নী বললো-
তুমি বসো, আমি দেখছি কে এসেছে।
.
দরজা খুলেই সায়নী পাশের বাসার নতুন বউ এর দেখা পেলো। সাথে তার শ্বাশুড়ি সীমা আক্তারও এসেছেন।
তারা সায়নীর সাথে এসে সোফায় বসলেন।
-এই হলো আমার পুত্রবধু। তোমার সাথে দেখা করাতে আনলাম।
.
নতুন বউ এর দিকে তাকিয়ে সায়নী বললো-
ভালো আছো?
-জ্বী আছি।
.
মহিলাটি তার ছেলের বউ কে উদ্দেশ্য করে বললেন-
এইটা হলো প্রথম বউ। কতো ধৈর্য্য এই মেয়ের! ঘরে আরেকটা বউ আনছে তাও সে চুপচাপ আছে। আর ওই মুনিরা মানে ছোট বউ টা এতোটা বেহায়া সব কিছু জেনেও পড়ে আছে এখানে।
.
-আপনি এসব বলতে এসেছেন এখানে?
.
আফরানকে দেখতে পেয়ে সীমা আক্তার চমকে গেলেন। থতমত খেয়ে তিনি বললেন-
আসলে...
.
সোফার উপরে বসে নতুন বউ এর উদ্দেশ্যে আফরান বললো-
মানুষের শোনা কথায় কান দিতে নেই। আমি ইচ্ছে করে দুটো বিয়ে করিনি।
-আমি কি শুনতে পারি আপনার কাহিনী?
-হু।
সায়নীকে ভালোবাসি আমি। বিদেশ থেকে ফিরে এসে হঠাৎ তার বিয়ের কথা শুনে মানতে পারিনি। বাবা নিজে বিয়েটা করাবেন বলে জানিয়েছেন। ওই সময় কি করবো মাথায় কাজ করছিলো না। তাই সায়নীকে বাধ্য করি আমাকে বিয়ে করতে। ওর হবু বর দেশে আসার পরেই বাবাকে সব জানাবো ঠিক করি।
.
নতুন বউটি উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো-
তারপর?
-বাবার সাথে মুনিরার গ্রামের বাড়িতে তার ব বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে এটেন্ড করতে যাই আমি। ওখানে তার হবু বর আনাস আসার পথেই মারা যায়। যে কারণে মেয়েটিকে মানে মুনিরাকে অলক্ষী হিসেবে গ্রামের সকলে অপমান করতে থাকে। বের হয়ে যেতে বলে গ্রাম থেকে।
বাবার বন্ধুর মেয়ে মুনিরা। আর মুনিরার বাবা আমাকে ছোটবেলায় পানি ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন। এভাবে তাকে করা অপমান সহ্য করতে না পেরে বাবা আমার থেকে জিজ্ঞাসা না করেই বলে ফেললো, মুনিরাকে বিয়ে করবো আমি।
বাবাকে যদিও আমি বলেছি এই বিয়েটা আমি করতে পারবোনা তবে আমার গোপন বিয়ের কথা এতো এতো মানুষের সামনে বাবাকে জানাতে পারিনি আমি।
এদিকে একটা মেয়ের অসহায়ত্ব দেখে আমারো খারাপ লাগছিলো। কি হয়েছিলো জানিনা আমার, তবে হ্যাঁ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। বিয়ে করে নিই মুনিরাকেও।
কিন্তু আমার মন তো সায়নীতেই আটকে ছিলো। তাই সিদ্ধান্ত নেই ডির্ভোস দিবো মুনিরাকে।
মুনিরাকে শুরুতে সবটা লুকোই আমরা। সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। কিছুদিন পর আমরা বলার আগেই মুনিরা আমাদের ব্যাপারে জেনে যায়। তবে সবটা না৷ সে ভেবেছিল আমাদের মাঝে অবৈধ সম্পর্ক আছে।
-জেনে কি করলো?
-জানার পর সে সায়নীকে অপমান করলো৷ মিথ্যে অপবাদ সহ্য করতে না পেরে সায়নী তাকে সব সত্যিটা জানায়।
সব জানার পরেও নিজের কথা ভেবে মুনিরা থাকতে চায় এই বাড়িতে। সায়নী এটা মানতে পারবেনা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। রাস্তায় ছুটতে থাকে পাগলের মতো। হঠাৎ একটা গাড়ি সায়নীর দিকে এগিয়ে আসলে মুনিরা তাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই এক্সিডেন্ট করে বসে।
-কোনো ক্ষতি হয়েছে কি তার?
-আল্লাহর রহমতে হয়নি। সুস্থ হয়ে যায় মুনিরা। তবে এই ঘটনার পরেই সায়নীর মনে জন্মে তার জন্য ভালোবাসা। কিন্তু মুনিরা তখন আমাদের মাঝ থেকে সরে যেতে যায়। দুইটা ভালোবাসার মানুষের মাঝে দেয়াল হয়ে থাকতে চায়নি সে।
-তবে এখনো যায়নি কেনো?
-সায়নীর জন্য। সায়নীর প্রায় অসুস্থ থাকতো। তাই তার টেস্ট করিয়েছিলাম৷ টেস্টের রিপোর্ট আসলো তার ব্রেইন টিউমার হয়েছে। সায়নী ভেবেছিলাও সে সুস্থ হতে পারবেনা। তাই সে চেয়েছে মুনিরা আমার পাশেই থাকুক। তার অবর্তমানে মুনিরাই আমার খেয়াল রাখতে পারবে।
-তারপর?
-তারপর আর কি। দুই বোনের মাঝে কথা হয়েছে সায়নী সুস্থ হয়ে ফিরে আসলেও মুনিরাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেনা।
-হুম।
-সায়নীর মন বলছিলো সে সুস্থ হবেনা। তাই সে বাবাকেও আমাদের বিয়ের ব্যাপারে জানাতে চায়নি আর।
কিন্তু মুনিরা ঠিকই বাবাকে মেনেজ করে নেয়। সায়নী বাবার মেয়ের জায়গা দখল করে ছিলো। আর মুনিরা সবটা মেনে নিয়েছে তাই বাবাও মেনে নেয় আমাদের।
-আপনি মানতে পেরেছেন কি মুনিরাকে?
-এই এক বছরেও পারিনি। তবে এখন চেষ্টা করছি।
.
আফরানের কথা শুনে সীমা আক্তার বললেন-
কি দরকার এত মানা মানির? ওই মেয়েকে ছেড়ে দিলেই হয়। এক ঘরে দুইটা বউ! ছি ছি...
.
কথাটি শুনে তার ছেলের বউ বললো-
ছি টা শুধু মুনিরা আপুর জন্যই কেনো! যা করেছে আফরান ভাইয়া ও সায়নী আপু৷ তাই বলে মুনিরা আপু কেনো শাস্তি পাবে? তিনি তো চলে যেতেই চেয়েছিলেন।
-তখন সায়নী অসুস্থ ছিলো এখন সে সুস্থ। বাচ্চাও হচ্ছে তার। একটা মেয়ের পক্ষে কি করে মেনে নেয়া সম্ভব এসব? তুই হলে কি করতি?
-আপনাকে মুনিরা আপুর মতো আশা দিয়ে পরে ঠকানো হলে আপনি কি করতেন মা? সতীনের ঘরে সন্তান হতে যাচ্ছে শুনেও মেনে নিতেন এসব?
-আরে মুনিরার মা বাবা আছে। সায়নীর আপন বলতে এই আফরানই আছে।
-কিন্তু সায়নী আপুকে মুনিরা আপুর মতো অলক্ষী অপবাদ শুনতে হয়না। মুনিরা আপুর জন্য তার মা বাবাকেও কথা শুনতে হয়। আমি মুনিরা আপুর জায়গায় থাকলে কখনো নিজের স্বামীকে ছেড়ে যেতাম না।
-আমিও সায়নীর জায়গায় থাকলে জামাই ছেড়ে যেতাম না।
.
শ্বাশুড়ী বউ মার কথা শুনে মৃদু হেসে সায়নী বললো-
আমরাও সেটা পারছিনা। পরিস্থিতি, ভুল, সম্মানহানি, বেহায়াপনা যাই হোক না কেনো, নিজের স্বামিকে ছেড়ে যেতে পারছিনা আমরা।
আপনারা হয়তো খুব সহজেই বলে দিচ্ছেন যেকোনো একজন থাকলেই ভালো হতো। কিন্তু সে যেকোনো একজন কে হবে? আপনার মতে আমি আর আপনার পুত্র বধুর মতে মুনিরা। কিন্তু ঘটনা আমাদের সাথে ঘটেছে। তাই আমরাই যেতে পারছিনা।
.
সায়নীর কথা শুনে সীমা আক্তার বললেন-
আফরান যাকে ভালোবাসে সে থাকলেই হয়।
-বিষয়টা এখন শুধু ভালোবাসাতে সীমাবদ্ধ নয়।
নিজেকে একজনের জায়গায় দাঁড় না করিয়ে দুজনের জায়গাতেই দাঁড় করান। আপনি হলে কি করতেন তখনি বুঝতে পারবেন। যত যাই হোক, নিজের স্বামী কে ছেড়ে দেয়া সম্ভব নয়। কেননা এখানে আফরানের দোষ নেই। সে কেবলমাত্র পরিস্থিতির স্বীকার।
.
কথাগুলো বলার পর লম্বা একটা শ্বাস ছাড়লো সায়নী। মনে যাই চলুক বাইরে তা প্রকাশ করা যাবেনা।
.
.
আড়াল থেকে কথা গুলো শোনার পর মুনিরার মনে আসলো-
আমি আসলেই দুইটা ভালোবাসার মানুষের মাঝে দেয়াল হয়ে আছি কি!
.
.
.
সকাল ৫.৩০....
নামাজ সেরে পড়ার টেবিলে বসে এক মনে পড়ে চলেছে মুনিরা। মাঝেমাঝে তার মনে চলে আসছে সীমা আক্তারের বলা কথাগুলো। সেসব কথা ভুলে যাওয়ার জন্য জোরে জোরে শব্দ করে পড়ছে সে।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠলো।
স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো তার মায়ের ফোন।
এতো সকালে মা ফোন করেছে কেনো!
কোনো এক অজানা ভয় কাজ করছে মুনিরার মাঝে।
দেরী না করেই ফোন রিসিভ করলো সে।
তখনি ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার মা বলে উঠলো-
মুনিরা রে..... সব শেষ হয়ে গেলো মুনিরা, সব শেষ হয়ে গেলো।
.
মায়ের এমন আহাজারি শুনে বুকের ভেতরটায় ধুক করে উঠলো মুনিরার।
চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। মায়ের উদ্দেশ্যে সে বললো-
কি হয়েছে আম্মা? এমন করছো কেনো তুমি?
-তোর বাবা ঘুম থেকে উঠছেনা মুনিরা। নামাজ পড়তে উঠছেনা। বাড়ির সবাই তাকে ডাকাডাকি করছে তাও উঠছেনা। সবাই বলছে তার শরীরটা আছে প্রাণ নাকি নাই।
এসব কি বলছে সবাই! তুই আয় মা। এখুনি আয়। নিশ্চয় তোর ডাকে সাড়া দিবে তোর বাবা। তুই না ডাকলে সে না উঠে পারবেই না। আয় মা তুই।
.
.
আফরানদের দরজায় ধুমধুম শব্দ শুনতে পেরে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তাদের।
চোখ জোড়া কচলিয়ে সায়নী বললো-
এই সকালে কে?
-মুনিরা নয়তো?
.
দরজার ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুনিরা বলছে-
আপু দরজা খুলো।
.
মুনিরার গলার এমন শব্দ শুনে নিজের বাবার জন্য আফরানের মনে ভয় কাজ করা শুরু করলো। ঠিক আছে তো তার বাবা!
.
আফরানের উদ্দেশ্যে সায়নী বললো-
দরজা টা খুলো আফরান তাড়াতাড়ি।
.
দরজা খোলার পরেই আফরান কে দেখতে পেয়ে তার বুকের মাঝে ঝাপিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকলো মুনিরা।
বিছানা ছেড়ে উঠে এসে সায়নী জিজ্ঞাসা করলো-
মুনিরা কি হয়েছে তোর? এমন করছিস কেনো?
.
আফরানের কাছ থেকে নিজের সরিয়ে নিয়ে সায়নীর পাশে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে মুনিরা বললো-
আপু.. আমার আব্বা নাকি চোখ খুলছেনা। সবাই বলছে তিনি নাকি...
.
আর কথা বলতে পারছেনা মুনিরা।
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো সে।
মুনিরার কথাটি শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো আফরান ও সায়নী দুজনেই। এইতো একমাস আগেই নুরুল আলম কে সুস্থ দেখেছেন তারা। এখন এসব কি শুনছে!
নিজেকে সামলে নিয়ে মুনিরার উদ্দেশ্যে সায়নী বললো-
সামলা নিজেকে। তুই এমন করলে তোর মায়ের কি হবে!
.
সায়নীর কোনো কথা যেনো মুনিরার কানে যাচ্ছেনা। এক নাগাড়ে কেঁদে চলেছেই সে।
আফরানের দিকে তাকিয়ে সায়নী বললো-
মুনিরার গ্রামে যাবার ব্যবস্থা করো। ড্রাইভার কে ফোন দিয়ে গাড়ি বের করতে বলো?
-বাবাকে বলবো?
-নিশ্চয়। বাবার বন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ তাকে জানাতে হবে।
.
মুনিরার পিঠে হাত বুলিয়ে সায়নী বললো-
মুনিরা শক্ত হো। গ্রামে যেতে হবে তোকে।
.
.
সকলে তৈরী হলেও আফজাল খানের কথায় সায়নী হয়নি।
সায়নী প্রেগন্যান্ট। এই অবস্থায় তার ওখানে যাওয়া ঠিক হবেনা।
ইচ্ছে থাকলেও বাবার কথা রাখলো সায়নী।
গাড়িতে উঠার আগে তার পাশে এসে আফরান বললো-
সকাল ৭টাই হাসি আসবে তোমার কাছে। নিজের খেয়াল রেখো।
-বাবার শরীর তো ভালোনা। খেয়াল রেখো উনার। মুনিরার আর নিজের ও রেখো।
-হু।
.
.
.
সকাল ১০টা পার হলো মুনিরা যখন তার গ্রামের বাড়ি এসে পৌছায়।
তার বাবার শেষ গোসল কাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র।
বাড়ির ড্রয়িং রুমে পাটি বিছিয়ে দেহটা সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
মুনিরা ধীরেধীরে এগিয়ে গেলো বাবার মৃত দেহটার দিকে।
মুখের উপর থেকে কাপড় সরাতেই যেনো সে স্তব্ধ হয়ে গেলো।
কিছুক্ষণ পলকহীন চোখে বাবাকে দেখার পর ফুফিয়ে কেঁদে উঠে বললো সে-
আম্মা বলেছে, আমি বললে নাকি তুমি ঘুম থেকে উঠে যাবে। তাই আমি ছুটে এসেছি। উঠোনা আব্বা ঘুম থেকে। দেখোনা তোমার মেয়ে এসেছে।
.
বাবার কোনো সাড়া না পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলো মুনিরা।
আফরানের মনে পড়ে গেলো তার মা হারানোর দিনটির কথা।
আফরান তার পাশে এসে বসে বললো-
শান্ত হও মুনিরা, শান্ত হও।
.
আফজাল খান ও এক পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলে চলেছেন।
আর বিড়বিড় করে তিনি বলছেন-
মেয়ের সুখটা দেখে যেতে পারলি না রে নুরুল!
.
.
.
-তোর সাথে একটা রাজপুত্রের বিয়ে দিবো আমি। রাজরানী হয়ে থাকবি তুই।
-আমার তো রাজকুমারী থাকতেই ভাল লাগছে।
-রাজকুমারী একসময় রাজরানী হয়রে মা।
.
নিজের বাবার কথা মনে হতেই চোখের কোণায় পানি চলে এলো সায়নীর।
এক দিনেই মা বাবাকে হারিয়েছে সে এক্সিডেন্টের মাধ্যমে।
তার উপর দিয়ে কি বয়ে গিয়েছে সে ছাড়া কারো বোঝার উপায় নেই।
মা মানেই মমতাময়ী। আর বাবা মানেই মাথার উপরের ছায়া।
দুজনের একজনেরও সায়নীর নেই। তাই সে মুনিরার কষ্ট টা উপলব্ধি করতে পারছে সহজেই।
.
.
.
বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেলো।
দাফন কাজ সম্পন্ন করেই মাত্রই ঘরে এসেছে আফরান।
সে দেখতে পেলো মুনিরাকে ঘিরে ধরেছে গ্রামের প্রায় মহিলা।
আফরান একটু কাছে যেতেই শুনতে পেলো একটি মহিলার কথা।
-আরে আমিতো বলেছিলামই এই মেয়ে রাক্ষুসী। প্রথমে ভালো পোলা আনাস রে খাইছে আর এখন নিজের বাপরে। এতো চিন্তা করলে মানুষ বাঁচতে পারে! সংসারেও অসুখী এই মাইয়া। তাই নাকি আরেকটা বিয়ে দেবার কথা চলছিলো। বাপটা এসব নিয়া চিন্তা করতে করতেই মারা গেলোরে... নাহলে সুস্থ মানুষ। রাতে ঘুম দিলো। সকালে আর উঠলোনা। মেয়ের চিন্তায় ঘুমের মাঝেই ওপারে চলে গেলো।
.
মুনিরার পাশে এসে আফরান বললো-
এই মহিলা কে?
.
শান্ত গলায় মুনিরা জবাব দিলো-
আমার ফুফু।
-ফুফু হয়ে নিজের ভাই এর মেয়ের নামে এসব কি বলছেন আপনি?
-ওহ হো! আসছে আমার ভালো পোলা! দুই বিয়া করেও গলার জোর কমেনাই তাইনা তোমার? মুনিরারে তো আরেকটা বিয়া দিতে চাইছো শুনলাম। তা এখুনি রেখে যাবে নাকি তাকে?
.
সেনোয়ারা বেগম এতাক্ষণ চুপচাপ তার কথা শুনলেন।
এপর্যায়ে মুখ খুললেন তিনি-
জামাই তুমি মুনিরাকে নিয়ে চলে যাও। তুমি তো মুনিরার আব্বাকে কথা দিয়েছিলে মুনিরার খেয়াল রাখবে। কথা রাখবেনা বলো?
.
তার পাশে এসে মুনিরা বললো-
আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবোনা মা।
-আমার কসম লাগে তোকে যেতে হবে। নাহলে এরা তোকে শান্তিতে থাকতে দিবেনা মা। যা চলে যা তুই, চলে যা।
.
.
.
রক্তাক্ত তিনটা শরীর। চেহারা বোঝারও উপায় নেই কোনটা কে।
তবে হ্যাঁ একটা তার বাবা, একটা মা আরেকটা তার খালা ডাক্তার শনাক্ত করছেন।
চোখের সামনে তিনজন আপন মানুষের লাশ দেখে চিৎকার করে উঠলো সায়নী।
.
সায়নীর চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেলো হাসির।
সায়নী ঘুমের মাঝে আবোলতাবোল বলে যাচ্ছে।
হাসি তাকে ডেকে বললো-
সায়নী আপু, ঠিক আছো তুমি?
.
ঘুম ভেঙ্গে গেলো সায়নীর।
স্বপ্নে তার মা বাবা হারানোর দিনটা আবারো দেখতে পারলো সে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বললো সায়নী-
মা, বাবা এভাবে চলে গেলে তোমরা আমাকে ফেলে!
.
হাসি বুঝতে পারলো আজ অনেক বছর পরে মুনিরার বাবার মৃত্যুর সংবাদ শুনে নিজের মা বাবার কথা মনে পড়ছে সায়নীর।
হাসি সায়নীর জন্য পানি আনতে এগিয়ে যাচ্ছে ডাইনিং রুমের দিকে।
তখনি কলিং বেলের শব্দ শুনতে পেলো সে।
ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো রাত ১১.২০!
এতো রাতে কে হতে পারে তা দেখার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেলো সে।
.
সায়নীও এগিয়ে গেলো ড্রয়িং রুমের দিকে।
.
.
মুনিরাকে মেঝের উপর চুপচাপ বসে থাকতে দেখে সায়নী তার পাশে এসে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো তাকে।
মুনিরা ফুফিয়ে কেঁদে বলে উঠলো-
কাল পাশের বাসার মহিলাটা বলেছিলো না আমার মা বাবা উভয়ই আছে! তাকে ডেকে বলো আপু আমার বাবা আর নেই! তাকে ডেকে বলো....
.
(চলবে)
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author
1 comment
Sort by