বৈধ সম্পর্ক - সিজন দুই | সাজি আফরোজ (পর্ব ৩)

 বৈধ সম্পর্ক - সিজন দুই | সাজি আফরোজ (পর্ব ৩)

বৈধ সম্পর্ক - সিজন দুই | সাজি আফরোজ (পর্ব ৩)

বৈধ সম্পর্ক - সিজন দুই | সাজি আফরোজ (পর্ব ৩)


সকালে ঘুম ভাঙতেই ঘড়ির দিকে তাকালো আফরান।
এ কি! সকাল ৯টা পার হয়ে গিয়েছে কিন্তু সায়নী তাকে ডাকেনি!
চোখ জোড়া কচলাতে কচলাতে উঠে পড়লো আফরান। তখনি আগমন ঘটলো সায়নীর।
-কিরে? আমায় ডাকলে না কেনো? অফিসের দেরী হয়ে গেলো অনেকটা।
-আজ অফিসে যাওয়া হচ্ছেনা তোমার।
-মানে?
-উহু আফরান! ভুলে গেলে আজ খালাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়াতে হবে। তারপর রাতে তোমার বন্ধুর বিয়ে আছে,ওখানে যেতে হবে।
-খালাকে আমি বাসায় পৌছে দিয়ে অফিসে ঘুরে আসতে পারতাম। কালও যাওয়া হয়নি। আর বিয়েতো রাতে!
-এখন থেকে এতো দৌড়াদৌড়ি করলে রাতে দেখতে আনফ্রেশ লাগবে তোমাকে।
-আমি আফরান খান জনাবা!
আনফ্রেশ আমার ডিকশনারি তে নেই।
.
আফরানের কথা শুনে হাসতে থাকলো সায়নী।
আফরান মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো-
সকাল সকাল আমাকে মেরে ফেলার ধান্দা করছো নাকি?
-হু করছি তো। উঠো এইবার। নাস্তা করে হাসপাতাল যাও।
.
আফরান বিছানা ছেড়ে উঠতেই সায়নী বলে উঠলো-
তুমি কাল নিজের শার্ট নিজে ধুয়েছো! বাহবা! আমি একদিন না থাকাতে কতো উন্নতিই না হয়েছে তোমার।
-বুঝলাম না?
-আরে বারান্দায় পেয়েছি তোমার শার্ট টা ঝুলানো অবস্থায়। আলনায় রেখেছি। ভালোই ধৌত করতে পারো দেখছি। যাই হোক ফ্রেশ হয়ে আসো টেবিলে।
.
সায়নী বেরিয়ে যেতেই আফরান এগিয়ে গেলো আলনার দিকে। কালকে হাসপাতাল থেকে আসার পর সে শার্ট টি বিছানার উপরে রেখে গিয়েছে স্পষ্ট মনে আছে। তাহলে কে ধুয়েছে? মুনিরা?
শার্ট টা হাতে নিয়ে মুচকি হেসে আফরান আপনমনে বললো-
এই মেয়ে অন্য কারো বউ হলে নির্ঘাত তার মায়া জাল থেকে স্বামী বেরিয়ে আসতে পারতো না। মুনিরা মানেই একটা মায়াবতী।
.
.
.
ডাইনিং টেবিলে নাস্তা করতে এসেই মুনিরা ও সায়নীর দেখা পেলো আফরান।
চেয়ার টেনে বসতেই সায়নী বললো-
একটা কথা ছিলো।
-হু বলো?
-তোমার সাথে আজ মুনিরাকে নিয়ে যাবে হাসপাতালে? খালাকে দেখতে চায়ছে ও।
.
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে মুনিরার উদ্দেশ্যে আফরান বললো-
তৈরী হয়ে আসো।
.
এতো সহজে আফরান রাজি হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি তারা৷ মুনিরা উৎসুক কণ্ঠে বলে উঠলো-
এখুনি আসছি।
.
মুনিরা ছুটে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সায়নী তার উদ্দ্যেশ্যে বললো-
ওই পাগলি মেয়ে? নাস্তা তো করে যা?
-পরে করবো আপু।
.
মুনিরা চলে গেলে সায়নী মুচকি হেসে বললো-
মেয়েটার ছেলেমানুষী এখনো গেলো না।
-হু, বয়স কম তো। দেখছোনা এমন ভাবে ছুটছে যেনো হাসপাতাল না বেড়াতে নিয়ে যাবো তাকে।
.
কথাটি বলেই খাওয়াই মনোযোগ দিলো আফরান।
সায়নী নিজের মনে বললো-
তোমার সাথে বেরুতে পারবে বলেই এতোটা উৎফুল্ল সে। তোমাকে যে সেও বড্ড ভালোবাসে। একদিন হয়তো তা তুমিও বুঝবে।
.
.
গাড়িতে বসে আছে মুনিরা ও আফরান। আফরান ব্যস্ত ড্রাইভিং করতে। তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রয়েছে মুনিরা। আফরান কে যেনো ঠিক বাংলা সিনেমার হিরোর মতোই লাগছে তার কাছে!
আফরান তার দিকে তাকাতেই চোখ সরিয়ে বাইরে তাকালো মুনিরা। ঠিক তখনি চোখে পড়লো ছোটখাটো একটা ফুসকার দোকান।
উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুনিরা বলে উঠলো-
ফুসকা!
.
সাথে সাথে গাড়ি থামিয়ে দিলো আফরান। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
খাবে তুমি?
-হু।
-এখানে বসো। আমি নিয়ে আসছি। গাড়িতে বসেই খেতে হবে কিন্তু।
.
গাড়ি থেকে বেরিয়ে আফরান এগুলো দোকানের দিকে।
মুনিরা নিজের গায়ে চিমটি দিয়ে বিড়বিড় করে বললো-
না আমি স্বপ্ন দেখছি না!
.
.
.
সকাল ১১টা...
আফজাল খানের আরেকবার চা খাবার সময় হয়েছে। সায়নী তার জন্য চা নিয়ে এগিয়ে গেলো তার রুমে।
চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রেখে সায়নী বললো-
বাবা তোমার চা খেয়ে নাও।
-একটু বসবি মা?
.
আফজাল খানের কথায় বসে পড়লো সায়নী।
তার দিকে তাকিয়ে আফজাল খান বললেন-
আফরান আর মুনিরা একইসাথে বাইরে বলে কি তোর মন খারাপ হয়েছে?
-কি যে বলোনা বাবা! এসব পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে এমন ধারণা আমার আগেই ছিলো। সবটা জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।
-কিন্তু আফরান তার প্রাপ্য অধিকার এখনো মুনিরাকে দিতে পারেনি। হ্যাঁ মুনিরাকে সে অনার্স কমপ্লিট করানোর জন্য কলেজে ভর্তি করিয়েছে, কোনো কিছু অভাব হতে দিচ্ছেনা। কিন্তু ভালোবাসা?
স্বামীর ভালোবাসা ছাড়া সংসার অপূর্ণ। এটা মানিস তুই?
-হু।
-কখনো যদি মুনিরাকে আফরান ভালোবাসতে শুরু করে মানতে পারবি তুই?
.
সায়নীর মনে হচ্ছে তার গলাটা ধরে আসছে। কথা আসছেনা মুখ দিয়ে কোনো।
তার অবস্থা বুঝতে পেরে আফজাল খান বললেন-
যদি নাই পারিস মুনিরাকে এই সম্পর্ক থেকে বেরুতে বাধ্য কর। মেয়েটার বয়স কম। বড় আবেগি মেয়ে। তার প্রথম ভালোবাসা আফরান বলেই এতোকিছু সহ্য করেও এক বছর সে এখানে পড়ে আছে। আমি চাইনা মুনিরা তার সারাটা জীবন এভাবে নষ্ট করুক।
.
.
নিজের রুমে বসে আছে সায়নী। আফজাল খানের কথা তার কানে বাজছে। কানে বাজছে মুনিরাকে দেয়া তার নিজের কথাও।
আসলেই মুনিরা তার প্রাপ্য অধিকার পাচ্ছেনা। তার উচিত মুনিরার প্রাপ্য অধিকার পেতে সাহায্য করা। কিন্তু এর মানে হলো আফরানকে ভাগ করে নেয়া।
আফরান যদি চাইতো তাহলে নিশ্চয় কিছুই করার ছিলোনা সায়নীর। কিন্তু আফরান তো নিজেই এই সম্পর্ক টা আগাতে চায়না। সে নিজেই বা কি করতে পারে! আর যদি আফরান সম্পর্ক টা আগাতো তাহলে কি করতো সে?
নানারকম প্রশ্নে অস্থির হয়ে আছে সায়নীর মন।
গোপনে বিয়ে করার, মুনিরাকে শুরু থেকে কিছু না বলার শাস্তি যে তাকে এভাবে পেতে হবে ভাবেনি সে।
না চাইতেও কাঁদতে তার অনেক বেশিই ইচ্ছে করছে।
একপর্যায়ে ফুফিয়ে কেঁদে উঠলো সায়নী।
উপরের দিকে তাকিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে উঠলো-
হে আল্লাহ! মুনিরাকে দেয়া কথা আমি ফেলতে চাইনা। আবার আফরান আর কাউকে ভালোবাসবে এটাও আমি মানতে পারবো না। তুমিই আমাকে রাস্তা দেখাও। এমন কিছু একটা করো যাতে সবটা সহজ হয়ে যায়, সবটা আমি মানতে পারি। মুনিরাকে আমাদের মাঝে রাখার একটা ব্যবস্থা করে দাও। আফরান আর আমি দুজনেই যেনো ওর প্রাপ্য অধিকার থেকে ওকে বঞ্চিত না করি। আমার মনে এই নিয়ে যেনো কোনো সংশয় না থাকে এই ব্যবস্থা তুমি করে দাও আল্লাহ! তাও যদি না পারো আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও আল্লাহ, নিয়ে যাও। তবুও আমি কথার খেলাপ করেছি, সতীন সতীনই হয় এমন কোনো কথা শুনতে পারবো না।
.
.
.
সন্ধ্যা ৭টা....
মুনিরার রুমে উপস্থিত হলো সায়নী।
সায়নীকে দেখতে পেয়ে মুনিরা বললো-
আপু কিছু লাগবে তোমার?
-হু লাগবে।
-কি?
-আজ আফরানের বন্ধুর বিয়ে। তুইও আমাদের সাথে যাবি।
-মানে?
-মানে যা শুনছিস তা। আকাশী রঙের কাতান শাড়িটা বের কর।
একই রকম করে সাজবো আজ।
.
মুখটা ফ্যাকাসে করে মুনিরা বলল-
উনি কিছু বললে?
-উনি কি বলবে! তুইও তার স্ত্রী।
-কাল আমার ক্লাস আছে আপু, ক্লান্ত হয়ে যাবো।
-তোর না টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেলো প্রথম বর্ষের? সামনে এমনিতেও বন্ধ কলেজ। একদিন না গেলে কিছু হবেনা। দেখি আয় তৈরী হয় দুজনে একসাথে।
.
.
ঢালা শাড়ি পরণে, কানে বড় ঝুমকো, ২হাতে ২ডজন চুড়ি, মাথায় খোপা করা, সে খোপায় বেলী ফুল। বাহ! সায়নীকে দেখতে বেশ লাগছে।
আফরান পরণে মাত্র শার্ট ঢুকিয়েছিল। সায়নী তার পাশে এসে বোতাম লাগিয়ে দিতে দিতে বললো-
আজ আমাদের সাথে অন্য একজনও যাবে।
-কে?
-মুনিরা।
-কিন্তু বাবা?
-দাড়োয়ান কাকাকে বলে দিয়েছি বাবার সাথে থাকতে।
-সায়নী?
-হু?
-খুব দরকার এটার?
-ও তোমার স্ত্রী আফরান। ওকে আমি কথা দিয়েছিলাম ওর অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে দিবোনা। কথা কি রাখতে পারছি আমি?
-আমি কথা দেয়নি।
-কিন্তু তুমিই ওকে সম্পর্কে আবদ্ধ করেছো। বিয়ে তো আর ছেলে খেলা নয়। ভুল যা করেছি আমরা করেছি। আমাদের ভুলের জন্য ও কেনো শাস্তি পাবে?
-সায়নী...
-মুনিরা যাচ্ছে আমাদের সাথে। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই হবে তোমাকে। কাউকে দুঃখে রেখে সুখী হওয়া যায়না আফরান। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি আমি। বেঁচে ফিরেছি বলে কথা খেলাপ করবো এমন মেয়ে আমি অন্তত নয়। তুমি বললেও বলতে পারো এটা ন্যাকামি!
.
.
বিয়ে বাড়িতে আলোর ঝলকানির মাঝে মুনিরার হাসিটা চোখে পড়লো আফরানের। সায়নীর মতোই একইভাবে সেজেছে সে। ভালোই লাগছে তাকে। এই প্রথম তাকে নিয়ে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে আসা হয়েছে। কতই না খুশি লাগছে মেয়েটাকে। অল্পতেই খুশি হয়ে যায় এই মেয়েটি।
-হ্যালো মি.আফরান খান!
.
পেছনে ফিরে পুরানো বান্ধবীর দেখা পেয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আফরান বললো-
তুমি!
-হু আমি! তোমার সাথে যোগাযোগ না থাকলেও দুলা মশাই এর সাথে ঠিকই ছিলো। তা বিয়ে সাদি করেছো?
-হ্যাঁ, তুমি?
-হুম। হাসবেন্ড দেশের বাইরে।
-ওহ!
-তা তোমার ওয়াইফ কোথায়?
দেখা করতে চাই। যে আফরানের জন্য মেয়েরা পাগল ছিলো তার বউ এর মুখ খানি দেখতে চাই।
.
মুচকি হেসে আফরান বললো-
নিশ্চয়, এসো আমার সাথে।
.
সায়নী ও মুনিরা একই পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো।
আফরান তার বান্ধবী কে নিয়ে এগিয়ে এসে সায়নীকে দেখিয়ে দিয়ে বললো-
মিট মাই ওয়াইফ সায়নী।
-হাই সায়নী! আমি আফরানের ক্লাসমেট ছিলাম।
-ও আচ্ছা! ভালো আছেন?
-হ্যাঁ। তুমি মাশাআল্লাহ অনেক বেশিই সুন্দর সায়নী। অবশ্য আফরানের বউ এমনি হওয়ার কথা!
.
মৃদু হেসে সায়নী জবাব দিলো-
ধন্যবাদ।
.
-বাই দ্যা ওয়ে তোমার পাশে এই মেয়েটি কে? একইভাবে সেজেছো তোমরা?
.
আফরানের দিকে তাকিয়ে সায়নী বললো-
তুমিই বলো আফরান। মুনিরা তোমার কি হয়?
.
(চলবে)

Tags:- অবৈধ সম্পর্ক,সাজি আফরোজ,সম্পর্ক কাকে বলে,সম্পর্ক pdf,সম্পর্ক কি,সম্পর্ক অর্থ,সম্পর্ক কবিতা,সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার উপায়,ভালোবাসার সম্পর্ক,সম্পর্ক মানে কি
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!