বৈধ সম্পর্ক - পর্ব ১৪

 বৈধ সম্পর্ক - পর্ব ১৪

বৈধ সম্পর্ক - পর্ব ১৪

 বৈধ সম্পর্ক - পর্ব ১৪ 


পাবেলের কথা শুনে আফজাল খান তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন-
কি বলছো তুমি?
-আমাকে ক্ষমা করবেন প্লিজ।
-তুমি কি বলছো তুমি জানো?
-হুম।কিন্তু কিছু করার নেই।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে আফজাল খান-
পাবেল বাবা কি হয়েছে, আমাকে বলো তুমি?
মা-বাবা মরা মেয়েটাকে কি জবাব দিবো আমি?শেষ মুহূর্তে এসে এসব কি বলছো তুমি!
-আমি আম্মুদের নিয়ে এখুনি বাসায় চলে যাচ্ছি,দয়া করে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।
পাবেল তার পাশ থেকে উঠে চলে যেতে চাইলে আফজাল খান তার একটা হাত ধরে ফেলেন।ছলছল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলেন-
মেয়েটাকে কি জবাব দিবো আমি?এই বুড়ো মানুষটার কথাও কি ভাববেনা?
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আফজাল খানের হাত সরিয়ে পাবেল কিছু না বলেই বেরিয়ে পড়ে রুম থেকে।
.
.
এদিকে মুনিরা জ্বরের ঘোরে সেই তখন থেকে সায়নীর সাথে আবোলতাবোল বলে চলেছে....
-আপু উনি আমাকে কার জন্য ভালোবাসেনা?আমাকে ছেড়ে দিবে বলেছে,কিন্তু আমি যেতে চাইনা আপু।উনার সাথে থাকতে চাই।
মুনিরাকে শান্তনা দিতে সায়নী বলে-
ঠিক আছে থেকো,এখন একটু ঘুমাও দেখি।
-ঘুম আসেনা আপু,ঘুমালেই গ্রামের মানুষের কথা মনে পড়ে।কতো অপমান করেছিলো তারা আমায়।আজ আমার নাম থেকে অপয়া শব্দটা সরতে গিয়েও সরছেনা।উনিও আমাকে ছেড়ে দিবেন।আর কতো অপমান সহ্য করবো আমি!
সায়নী খেয়াল করলো মুনিরা কথা গুলো বলার সময় তার চোখ দিয়ে পানি বেয়ে বেয়ে পড়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছে।আজ সায়নীরও এই মেয়েটার জন্য মায়া হচ্ছে।
হঠাৎ সায়নীর হাত ধরে মুনিরা বলে উঠে-
আপু প্লিজ তুমি উনাকে বুঝাও না!তোমার কথা শুনে উনি।আমাকে ছেড়ে না দিতে বলোনা প্লিজ।
-বলবো,যদি তুমি চুপচাপ ঘুমাও এখন।
-সত্যি?
-হুম।
.
.
পাবেল তার মাকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।তার মাকে কারো সাথেই সে কথা বলতে নিষেধ করেছে।ভাগ্যিস তার বাবা গতকাল রাতেই এক বন্ধুর বাসায় চলে গিয়েছিলেন।নাহলে তাকে মায়ের মতো বোকা বানিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতোনা।

দরজার খুব কাছাকাছি যেতেই আফরানের গলার স্বর শুনতে পায় তারা।
-পাবেল তোমরা কোথায় যাচ্ছো এতো সকালে?
আফরানের কথায় পেছনে ফিরে পাবেলের মা বলেন-
কি জানি বাপু!ছেলেটার কি হলো বুঝলাম না।
আফজাল ভাইয়ের সাথেও দেখা করতে নিষেধ করলো।
-কিন্তু কেনো?
মাকে কিছু বলতে না দিয়ে পাবেল বলে-
আফরান আমাদের এখন যেতেই হবে।
পরে কারণ-টা না হয় জানবে।
-অন্তত সকালের নাস্তাটা করতে?
মৃদু হেসে পাবেল বলে-
খেয়েছি ভাই এতোদিন অনেক।কিন্তু এখন সম্ভব না।এখন যে যেতেই হবে।
.
.
আফজাল খান হাতের কাগজটা বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়ালেন।খুবই অস্বস্তি হচ্ছে তার।
পাবেলের সাথে সায়নীকে বিয়ে দিবেন বলে সায়নীর জন্য অন্য কোথাও সম্বন্ধ দেখেননি।
মেয়েটাকে কতো বড় মুখ নিয়ে বলেছিলেন,পাবেল ভালো ছেলে তাকে খুব ভালো রাখবে।আর সেই পাবেল তাদের এতোবড় ধোঁকা দিয়ে চলে গেলো!মেয়েটার চোখাচোখি হবেন কি করে তিনি?কি বলবেন?শেষ মুহূর্তে এসে পাবেল বিয়েটা করবেনা বলেছে...
মানতে পারবেতো সায়নী এটা!
নাহ আর কিছু ভাবতে পারছেন না আফজাল খান।দু'চোখে ঝাপসা দেখছেন।
.
.
মুনিরাকে ঘুম পাড়িয়ে সায়নী ড্রয়িং রুমে এগিয়ে যেতেই আফরানকে দেখতে পায়।বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে।
-কি হয়েছে আফরান?
সায়নীর গলার স্বরে ভাবনার জগৎ থেকে বের হয়ে আফরান বলে-
পাবেল এতো সকালে তার মাকে নিয়ে চলে গিয়েছে তাদের বাসায়।
-কি বলছো!এই সকালে!
-হুম।
-ফুফু চলে গেলেন!আমাকে ডাকোনি কেনো?
সকালের নাস্তাটাও করেননি।
-ডাকার সুযোগ কই পেলাম।সেতো আমাকেও বলেনি,চলে যাওয়ার সময় আমি দেখতে পেয়েছিলাম।থাকতে বলেছি কিন্তু তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়েছে।
-কালকের রাতের কথাগুলোর জন্য কষ্ট পেয়েছে বোধহয় পাবেল।
-কি কথা?
-আমি পাবেল কে সব জানিয়ে দিয়েছি।
-কি?আমাদের কথা?
-হুম।
-বাবাকে যদি বলে দেয়?
-আমাদের কথা বলবেনা।তবে এই বিয়েটা সম্ভব নয় তা বলবে।কারণ-টা কি বলতে নিষেধ করেছি।
-কি বলো!
-আরে হুম।
-যাক একটা দিক সামলানো গেলো।
-জ্বী আপনি এবার মুনিরাকে আমাদের মাঝখান থেকে বের করারও ব্যবস্থা করেন।
-হেহে,করবো।
-খালু সব মেনে নিবে আমার বিশ্বাস।
-বাবাকে যদি পাবেল কিছু বলে থাকে তাহলে বাবা এতো চুপচাপ কেনো!
-মন খারাপ হয়েছে হয়তো।তুমি যাও,দেখে আসো।
-হুম যাচ্ছি।ও হ্যাঁ?
-কি?
-মুনিরার কি খবর?
-ঘুমোচ্ছে এখন।
.
.
আফরান এগুতে থাকে বাবার রুমে.....
পাবেলের চ্যাপ্টার বন্ধ হয়েছে এটাও কম কিসের!সায়নীর সাথে অন্য কাউকে নিয়ে এখন আর কোনো চিন্তায় থাকলোনা।
মুনিরার বাবারা গেলেই তার বাবাকে সবটা জানাতে পারবে।
-বাবা আসবো?
আফজাল খান হাত দিয়ে ইশারায় আফরানকে ভেতরে আসতে বলেন।
কথা বলার শক্তি নেই তার।
আফরান এক পা বাড়াতেই আফজাল খান মাটিতে লুটে পড়েন।বাবাকে হঠাৎ এভাবে পড়ে যেতে দেখে হতভম্ব হয়ে যায় আফরান।
অসহায় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে
চিৎকার করে বলে উঠে-
বাবা!
.
.
-ডাক্তার আমার বাবার কি অবস্থা?
-উনি হার্ট এট্যাক করেছেন।সঠিক সময়ে নিয়ে আসা না হলে বড় কিছু হতে পারতো।
.
.
আফজাল খান যখন মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন সেই সময় আফরানের চিৎকার শুনে আফজাল খানের রুমে মুনিরা ছাড়া সকলে উপস্থিত হয়।বাবাকে এমন অবস্থায় দেখে আফরান পাথর হয়ে যায়।সায়নী কোনমতে নিজেকে সামলিয়ে মুনিরার বাবা ও তাদের বাড়ির ড্রাইভারের সাহায্যে আফজাল খানকে হাসপাতাল আনতে সক্ষম হয়।মুনিরা অসুস্থ থাকায় তার সাথে তার মাকে থাকতে হয় বাসায়।
.
.
.
বেশ কিছুদিন পর.........
আফজাল খানকে বাড়িতে আনা হয়।এ কয়েকদিন রাত-দিন এক করে সায়নী তার সেবা করেছে।মুনিরা সায়নীকে সাহায্য করতে চাইলেও সায়নী করতে দেয়নি।আফজাল খানের এই অবস্থার জন্য সায়নী নিজেকে দায়ী মনে করে।সেদিন যদি পাবেল এসব না বলতো তাহলে হয়তো তার খালু আজ সুস্থ থাকতো।আর পাবেলকে এসব বলার জন্য সে নিজেই বলেছিলো।
সে কি করে ভূলে গিয়েছিলো যে এক বছর আগেই ডাক্তার তাদের সাবধান করেছিলো যেকোনো মুহুর্তে আফজাল খানের খারাপ কিছু হতে পারে।সেদিনের কথা শুনে তারা এই এক বছর বিয়ের কথা গোপন করে রেখেছে।আর আজ এক বছর পর এসেই সেদিনের ভয়টা সত্যি হয়ে গেলো!
আফজাল খানের পায়ের কাছে বসে পা দুটো ধরে সায়নী অনবরত কাঁদতে থাকলো।
আফজালে খানের ঘুম ভেঙ্গে যায়।সায়নীকে পায়ের কাছে দেখতে পেয়ে তার পাশে ডাকেন তিনি।সায়নী তার পাশে গিয়ে বসতেই তিনি বলেন-
আমি তোর জন্য পাবেলের চেয়েও ভালো ছেলে এনে দিবোরে মা।ওই পাবেল একটা বজ্জাতের হাড্ডি।আমার এতো ভালো মেয়েটাকে বিয়ে করবেনা বলছে।
-খালু তুমি এসব নিয়ে ভেবোনা একদম।
-আমার লকারে তোর বাবার সম্পত্তির দলিল,মায়ের গহন এসব রয়েছে।আমার কিছু হলে ওগুলো নিয়ে নিস।এতোদিন তো আমি সামলিয়ে রেখেছি।
সায়নী তার হাত ধরে বলে-
সবসময় তুমি সামলাবে।তোমার কিচ্ছু হবেনা,
আমিও তোমায় ছেড়ে কোথাও যাবোনা বলে দিলাম।আচ্ছা এসব এখন বাদ দাও আমি তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসি,খেতে হবেতো তোমাকে।
-হুম।
-কি খাবা বলো?
-তোর যা খুশি বানিয়ে আন।
-উম্ম...চিকেন স্যুপ?
-ঠিক আছে।
সায়নী রুম থেকে বেরুতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আফজাল খান।তিনি কি কোনো ভূল করে ফেলেছেন!সায়নীকে নিজের কাছেই রাখতে পারতেন তিনি।শুধুমাত্র পাবেলের সাথে বিয়ে ঠিক ছিলো বলে এই ব্যাপারে কোনোদিন ভেবে দেখেননি।আজ যদি মুনিরার সাথে আফরানের বিয়েটা না হতো তাহলে সায়নীকে....
নাহ যেটা এখন হওয়ার না সেটা নিয়ে ভেবে লাভ নেই।
.
.
রান্নাঘরে পা রাখতেই সায়নীর মাথাটা ঘুরে উঠে,মনে হচ্ছে এখুনি পড়ে যাবে সে।
কিন্তু খালুর জন্য কিছু একটা বানাতে হবে।
খালুর দায়িত্ব যে সে নিয়েছে।
ভেতরে ঢুকে চুলার পাশে যাওয়ার আগেই গলগল করে বুমি করে দেয় সে।
রান্নাঘরে মুনিরা বসে তরকারি কুটছিল।
সায়নীর হঠাৎ এমন অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি তার পাশে যায় সে।
.
.
-বাবা,আপু সবার শরীর খারাপ।এই সময়ে আমাকে ফেলে চলে যাবে তুমি আম্মা?
আর কটা দিন থাকোনা।
-তোর চাচার এই সময়ে শরীর খারাপ করে বসে থাকতে হয়ছে কি করবো বল!নাহলে ওই সায়নীর একটা গতি না করে আমি কি যেতাম!
-উফ আম্মা!তুমি শুধু আপুকে নিয়ে এসব কথা বলো কেনো!উনি তোমার কি ক্ষতি করেছে!
-ওরে বলদ তোর ক্ষতি করবে ওই মেয়ে।আমারতো মনে হয় ওই মেয়েই পাবেল কে শিখায় দিছে বিয়ে না করতে আর এসব ভাই সাহেব কে বলতে।নাহলে তুই বল শেষ সময়ে এসে উল্টানোর কারণ কি?
-এতো কিছু আমি জানিনা।আর হুম আম্মা আপুর নাম আছে একটা,সায়নী।ওই মেয়ে ওই মেয়ে করবেনা একদম।
-হুম এখন ভালো লাগবেনা মায়ের কথা।যেদিন সব হারাবি বুঝবি।
-মানে?
-সায়নীকে এর আগেও আমি কয়েকবার বুমি করতে দেখছি।সারাক্ষণ মাথা ঘুরে তার,দূর্বল লাগে।এসব কিসের লক্ষণ জানিস?
-কিসের?
-মা হওয়ার লক্ষণ।
-আম্মা!দোয়া করে থামো তুমি।চলেই যাও তুমি।তোমার এখানে থাকার দরকার নেই।
-যাবো যাবো,তবে সময় থাকতে সায়নীর পেটে কার বাচ্চা খবর নে।নাহলে কপাল পুড়বে তোর।
-আম্মা!
-আমি যাই,ব্যাগ গুছাই।জামাই এর সাথে দেখা হবেনা।একটু পরেই বের হয়ে যাবো,নাহলে পৌঁছাতে দেরী হয়ে যাবে।
মা কিসের ইঙ্গিত দিয়েছে তাকে?সায়নী এমন মেয়েই নয় বিয়ের আগে খারাপ কিছু করবে।তাছাড়া সায়নীর পেটে সন্তান আসলেও তার কেনো কপাল পুড়বে!
মা কি তাহলে তার স্বামীর সাথে সায়নীর....
নাহ,এসব কি ভাবছে সে।এমন জঘন্য চিন্তা সে করতে পারেনা।এটা অন্যায়।সায়নী তাকে নিজের বোনের মতোই দেখে।
এসব ভাবনা মাথা থেকে ফেলে বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে মুনিরা।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বিকাল ৫টা।
আফরান এখন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে বাবার অসুস্থতার জন্য।তাই মুনিরা তার জন্য কিছু বানাতে এগিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে।
(চলবে)


পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!