বৈধ ভালবাসা - পর্ব ৪

 বৈধ ভালবাসা
 - পর্ব ৪


শরীরটা এলিয়ে দেয় সায়নী।চোখ জ্বলছে তার প্রচুর কিন্তু ঘুম আসছেনা।
জীবনটা এতো কষ্টের কেনো!মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে সে।খালু আর আফরানের সাথে থাকতে থাকতে তাদের বড় আপন করে ফেলেছে।তাদের ছেড়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব না,কিছুতেই না।শুধু স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চায়না সে।মানুষগুলোর সাথেই থাকতে চায় সে।

বৈধ ভালবাসা - পর্ব ৪

বৈধ ভালবাসা - পর্ব ৪


-বালিশ নিতে এসেছি।আমি সোফায় শোবো।
আফরানের কথায় আবারো মুনিরার আশায় মাটি চাপা পড়ে।তবুও নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বলে উঠে-
একটু দাঁড়ান।
-কি?
মুনিরা খাট থেকে উঠে আফরানের কাছে গিয়ে তাকে সালাম করে বলে-
বাসর রাতে বউ থেকে জামাইকে সালাম করতে হয়।
-ওহ।কিন্তু দরকার ছিলোনা।
কথাটি বলেই আফরান এগুতে চাইলে মুনিরা আবার বলে উঠে-
আমার গিফট?
-কিসের?
-বাসর রাতে দিতে হয়তো বউ কে।
-আমিতো কিছু আনিনি।
-যেকোনো কিছু দিতে পারেন।কিন্তু দিতেই হবে।
আফরান চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে টেবিল থেকে একটি বই নিয়ে মুনিরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে-
এই নাও।এইটা তোমার উপহার।চলবে?
-দৌড়াবে।
মুচকি হেসে আফরান শুতে যায় সোফায়।
এদিকে মুনিরার মনটা খুশিতে নেচে উঠে।আফরান তার সাথে ভালো ব্যবহার করেছে,তাকে উপহার দিয়েছে।এটাই অনেক বড় পাওনা।যদিও আফরান ডির্ভোস দিবে বলেছে কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি!আফরান হয়তো বুঝতেও পারে বৈধ সম্পর্কের জোর কতটুকু।ওসব প্রেমতো বৈধ নয়।বিয়ে করা বউ ফেলেতো একদম নয়।স্বামীর মনে জায়গা করতে,
তাকে সঠিক পথে আনতে চেষ্টা সে করবেই।
বালিশটা সায়নীর চোখের পানিতে ভিজে গিয়েছে প্রায়।কি করবে কি করা উচিত মাথায় কিছু আসছেনা তার।এমন হবে জানলে আফরানের জীবনে কখনো আসতোনা সে।মনে পড়ছে তার আগের দিনগুলি......
বিবিএ শেষ করে সুইডেন এ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আফরান।ওখানেই এমবিএ করার ইচ্ছে আছে তার।
-তুমি সত্যি চলে যাবা?
-হুম সবতো রেডি।আর কিছুদিন পরেই....
ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠে সায়নী।
-কিরে কাঁদছো কেনো তুমি?সারাজীবনের জন্যতো যাচ্ছিনা আমি।চলে আসবো আবার।
-মিস করবো তোমায় অনেক।
-আমিও করবো।দেখি চোখ মুছো।
-হুম।
-এইতো ভালো মেয়ে।
-ঠিক আছে কি করছিলে করো,এখন যাই আমি।
-আচ্ছা।
-ও হে।খালু বাসায় নেই।অফিসের কাজে বাহিরে আছেন।কাল সকালে
আসবেন।
-ঠিক আছে।
অনেকক্ষণ যাবৎ সায়নীকে দেখছেনা আফরান।গেলো কোথায় মেয়েটা!
-আমাকে খুঁজছিলে?
সায়নীর ডাকে পেছনে তাকাতেই অবাক হয়ে যায় আফরান।সায়নী বাদামি রঙের একটি সুতি শাড়ি পরেছে।হাটু সমান লম্বা চুলগুলি খোলা রেখেছে সে।হাতে কাচের চুড়ি,নাকে ছোট্ট একটা নাকফুল,চোখে হালকা কাজল
সবমিলিয়ে সুন্দর লাগছে তাকে।
বেশ কিছুক্ষণ আফরান মুগ্ধ দৃষ্টিতে সায়নীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
-এই আফরান ভাই?কি হলো তোমার?ভালো লাগছেনা আমায়?
-দেখছি তোমাকে।
-কি দেখছো?
-সব ঠিক ঠাক আছে কিনা।
-হেহে।তা আছে ঠিক?
-উম্ম....লিপস্টিক দাওনি তো।
-এইরে একদম ভূলেই গিয়েছিলাম।দাঁড়াও আমি দিয়ে আসি।
-না।
-কি না?
-তোমার ঠোঁট এমনেও গোলাপি,না দিলেও চলবে।
খানিকটা লজ্জা পেয়ে সায়নী বলে-
লালতো না আর,লাল দিতে চেয়েছিলাম।
-উফ দিতে হবেনা।এমনি ভালো লাগছে।
-আচ্ছা তুমি যা বলো।
-তা আজ শাড়ি পরলে যে?
-ইচ্ছা ছিলো বফ এর সাথে শাড়ি পরে চাঁদ দেখবো,তা বফ তো হয়নি ভাবছি তুমি বিদেশ যাওয়ার আগেই তোমাকে একদিনের জন্য বফ বানিয়ে নেয়...
-হাহাহা।গুড আইডিয়া।আমারো গফ নেই তবুও এমন ভাবনা মাথায় আসেনি।না চাইতেও গফ পেয়ে যাবো ভাবিনি।হোক না একদিনের জন্য!চলো।
দুজনে ছাদে গিয়ে দেখে আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে।
-এই অসময়ে আকাশ মেঘলা কেনো!মনে হচ্ছে এখনি বৃষ্টি পড়বে।তোমার চঁাদ দেখাতো হলোনা।
-বৃষ্টি বিলাসতো হবে।
-মানে কি!তুমি ভিজবে বৃষ্টি হলে?
সায়নী জবাব দেওয়ার আগেই আকাশ থেকে ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পড়ে।সে আফরানের দিকে তাকিয়ে একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে ছাদের মাঝখানে চলে যায়।
-এই সায়নী?চলে আসো ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
-লাগবেনা।তুমি চলে যাও।
সায়নী বৃষ্টিতে ভিজছে আর আফরান মুগ্ধ চোখে তাকে দেখছে।সায়নীর মতো মেয়ে তার পাশে ছিলো বলেই হয়তো সে কারো প্রেমে পড়েনি এতোদিন।তাহলে সে কি সায়নীর প্রেমে পড়ে গিয়েছে!
-আহ!
সায়নীর শব্দে ঘোর কাটে আফরানের।পা পিছলে পড়ে গিয়েছে সায়নী।আফরান দৌড়ে গিয়ে তাকে উঠায়।কিন্তু সে ভালোভাবে হাটতে পারছেনা।বাম পা-টা মচকে গিয়েছে তার।দেরী না করে আফরান তাকে কোলে তুলে নিয়ে নিচে নামতে নামতে বলে-
বলেছিলাম না ভিজতে।পেলেতো ব্যথা এখন।
-সরি।
-আমাকে সরি বলে কি হবে,ব্যথাতো তুমি পেয়েছো।
সায়নীকে নিজের রুমে নিয়ে যায় আফরান।
খাটে বসিয়ে তার বাম পায়ের মচ-টা সারাতে চেষ্টা করে।
-আমার পায়ে হাত দিওনা।
-চুপ একদম চুপ।একটা কথাও কেমনে এই মেয়ে শুনেনা!
আফরান নিমিষেই কিভাবে যে তার পায়ের ব্যথা সারিয়ে দিয়েছে বুঝতেই পারেনি সে।
-দেখি হেটে দেখাওতো।
সায়নী বিছানা ছেড়ে উঠে অল্প একটু হেটে দেখিয়ে বলে-
বাহ তোমার হাতে জাদু আছে!
-এখনো বোঝা যাচ্ছেনা,আছে নাকি নেই।পুরো রুম হেটে দেখাও আমাকে,তারপর বোঝা যাবে।
-আরে ঠিক আছিতো।
-উফ...বড্ড কথা বলো তুমি।হেটে দেখো পায়ে ব্যথা হয় কিনা।ডাক্তারের কাছে যেতে হবে ব্যথা থাকলে।
-হুম।
-কি হুম।তাড়াতাড়ি দেখিয়ে নিজের রুমে গিয়ে জামা বদলে নিবা,নাহলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
সায়নী হাটতে থাকে।পুরো রুমে হেটে এসে আফরানের কাছে আসতেই আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়।বিদ্যুৎ এর বিকট শব্দে ভয় পেয়ে সায়নী জড়িয়ে ধরে আফরান কে।আর তার ছোঁয়া পেয়ে আফরান নিজেকে সামলাতে পারেনি।কাধ থেকে সায়নীর ভেজা চুল গুলো এক পাশে সরিয়ে আলতো করে ঘাড়ে চুমু খায় সে।তার ঠোঁটের স্পর্শে সায়নীর সারা শরীর শিহরিত হয়ে যায়।না চায়তেও সে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আফরান কে।আফরান ও তার সায় পেয়ে সায়নীর ভেজা পিটে হাত বুলাতে থাকে।
এটা কি করতে যাচ্ছে সে!নিজের সম্মান,খালুর বিশ্বাস এভাবে নষ্ট করবে!সায়নী নিজেকে আফরানের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে চলে যায়।
এদিকে আফরান-ও নিজের কাজের জন্য লজ্জিত হয়।সে কি করে পারলো এমন একটা কাজ করতে!
সেদিন থেকে আফরান ও সায়নী আর মুখোমুখি হয়নি।
দুজনের মাঝেই অপমানবোধ কাজ করছিলো।
দেখতে দেখতে আফরানের সুইডেন যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসে।তার খুব ইচ্ছা করছিলো
যাওয়ার আগে সায়নীর সাথে একটাবার কথা বলতে।কিন্তু সায়নী তাকে এড়িয়ে চলছে।সত্যি বলতে তার নিজেরও সংকোচ লাগছে তার সামনে দাঁড়াতেও।
লাগেজ নিয়ে আফরান দাঁড়িয়ে থাকে সদর দরজায়।
আত্নীয়,বন্ধু-বান্ধব অনেকে এসেছে তার সাথে দেখা করতে।কিন্তু তার চোখ শুধু সায়নীকে খুঁজছে।হতাশ হয়ে বের হওয়ার আগে শেষ বারের মতো পেছনে তাকায় সে।
হুম এবার সে সায়নীকে দেখতে পায়।নিঃশব্দে একপাশে দাঁড়িয়ে কেঁদে চলেছে সে।কেনো যেনো তার কান্না আফরানের সহ্য হচ্ছেনা।এক মিনিট-ও না দাঁড়িয়ে পা বাড়ায় সদর দরজার দিকে।
এদিকে সায়নীর-ও ইচ্ছে করছিলো আফরানের সাথে কথা বলতে,কিন্তু সেদিনের ঘটনার পরে কোনোভাবেই সে আফরানের মুখোমুখি হতে পারছেনা।আবার আফরানের জন্য তার কষ্ট-ও হচ্ছে।
-সায়নী মা??
খালুর ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বের হয় সায়নী।আগের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সকাল হয়ে গিয়েছে বুঝেনি।ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে সকাল ৬টা।এতো সকালে খালু কেনো ডাকছে!
তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠেই দরজা খুলে সে।
-খালু এতো সকালে তুমি?
-আরে একটা কথা বলতে একদম-ই ভূলে গিয়েছিলাম।পাবেল দেশে এসেছে।আজ সকাল ১০টাই বাসায় আসবে তোকে নিয়ে বাইরে কোথাও যাওয়ার জন্য।পরে যদি ভূলে যাই তাই এখনি তোকে বলতে এসেছি।
পাবেল দেশে এসেছে!এক বিপদের হাত থেকে না বাঁচতেই আরেক বিপদ হাজির।তার মোটেও ইচ্ছে করছেনা পাবেলের সাথে কোথাও যেতে।কি করা যায় এখন!
-কিরে কি ভাবছিস?
-খালু বাসায় এখন আত্নীয়-স্বজন রয়েছে,ওদের ফেলে কি করে যাই?
-হাহা,ওসব তোকে ভাবতে হবেনা।হাসির মাকে খবর দিবো আমি ও সামলাবে।তাছাড়া মেহমান আর তেমন কই আছে,চলেই যাবে সবাই।এখন একটা কাজও তুই করবিনা।আরাম কর।১০টার আগে তৈরি হয়ে থাকবি।পাবেল এসে নিয়ে যাবে তোকে।
খালু চলে যাওয়ার পর সায়নী দরজা বন্ধ করে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
এতো বাঁধা অতিক্রম করে সে কি আফরানের হয়ে থাকতে পারবে!
(চলবে)

written by  saji_afroz
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!