বৈধ ভালবাসা - পর্ব ১ ও ২ Valobasar Onuvuti

- বৈধ ভালবাসা - 

পর্ব ১ ও ২ Valobasar Onuvuti

শাড়ির আঁচল ঠিক করো। বেহায়ার মতো আমাকে শরীর দেখানোর প্রয়োজন নেই।
আফরানের কথায় বোকা হয়ে যায় মুনিরা।
জর্জেট এর শাড়ি পরেছে সে। কিন্তু পিন না দেওয়ার কারণে কখন যে আঁচলটা খানিকটা বুক থেকে সরে গিয়েছিলো বুঝতেই পারেনি।
তাই বলে আফরান এভাবে বলবে! সেতো আর পর পুরুষ নয়। তার স্বামী। ভালো করে বললেই হয়। অবশ্য ভালো ব্যবহার তার কাছ থেকে আশা করাও ঠিক হবেনা এখন।কেননা অন্য চার-পাঁচটা বিয়ের মতো তাদের বিয়েটা স্বাভাবিক নয়।
#মুনিরা....
গ্রামের মেয়ে। মা-বাবার খুব বাধ্য মেয়ে।এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর পরই বাবা তার বিয়ে ঠিক করে। তার বাবার মতে গ্রামের মেয়েদের এতো পড়া-শোনা করে লাভ নেই।
তার সাথে যে ছেলের বিয়ে ঠিক হয় তার নাম আনাস,
ছেলেটি দুবাই কাজ করে। বিয়ে করতেই দেশে এসেছে।
মুনিরাকে একবার দেখেই তার ভালো লাগে।
মুনিরারও ছেলেটিকে পছন্দ হয়। দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়েও ঠিক হয়।
কিন্তু বিয়ের দিন এমন একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে সে জানতোনা।


বৈধ ভালবাসা

বৈধ ভালবাসা


বিয়ের আসরে আসার পথেই মুনিরার হবু বর মারা যায়। তাদের গাড়িটি একটি ট্রাকের সাথে ধাক্কা লাগে। হবু বরের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয় মুনিরাকে। গ্রামের মানুষের মতে মুনিরা অপয়া বলেই আনাসের মৃত্যু হয়। আর তাই মুনিরাকে তারা আর এই গ্রামে রাখতে চায়না,গ্রামের আর কোনো ছেলের সাথে তার বিয়ের চেষ্টাও করা যাবেনা।

বৈধ ভালবাসা

ঘরের ভেতর থেকে এসব কথা শুনতে পায় মুনিরা। তার মা-বাবার সাথে গ্রামের মানুষের তর্ক হচ্ছে শোনা যাচ্ছে। আনাস মারা গিয়েছে, এতে কি তার নিজেরও কষ্ট হচ্ছেনা! বর না হোক,হবু বরতো ছিলো।তার কষ্ট টাও কেউ দেখছেনা। উল্টো অপবাদ দিচ্ছে।এসব কি তার প্রাপ্য ছিলো!ভাবতে ভাবতে তার ঘরের ভেতর কয়েক জন মহিলা ঢুকে পরে। হাত ধরে তাকে বাহিরে নিয়ে যায়। এক ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে একজন বলে উঠে--
এই মাইয়ার এহানে কোনো জায়গা নাই। এ মাইয়া গ্রামের পোলা সব খায় ফেলবো।এহনি এরে বের করো।
মুনিরার বাবা সবার কাছে মেয়ের সম্মান রক্ষার জন্য আকুতি মিনতি করছিলো।গ্রামের চেয়ারম্যান,মেম্বার কেউ-ই তাকে সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি।
আর তখনি আফজাল খান এসে মুনিরার বাবার হাত ধরে বলেন-
তোমার মেয়েকে আমি নিয়ে যাবো। আমার একমাত্র ছেলের পুত্র বধু হবে মুনিরা,যদি তোমার আপত্তি না থাকে।
আফজাল খানের কথা শুনে অবাক হয়েছিলো মুনিরার মা-বাবা। তার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছে আফরান!
#আফজাল খান.....
চট্রগ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাঝে একজন।তার একমাত্র ছেলে আফরান খান।
আফরানের মতামত ছাড়া তার বাবা এমন একটা কথা বলে বসবে সে ভাবেনি।তাড়াহুড়ো করে বাবার হাত ধরে একটু দূরে নিয়ে বলে-
বাবা তুমি এমন করতে পারোনা।আমি এতো পড়াশোনা করেছি একটা গ্রামের মেয়ে বিয়ে করার জন্য?
-মেয়েটা এইচ.এস.সি. পাশ করেছে। ওকে আমি আরো পড়াবো।
-না বাবা...কোনো কথা আমি শুনতে চাইনা -আফরান। মেয়েটা অসহায়। আমার বন্ধুর এমন অবস্থায় আমি ওকে সাহায্য করবোনা! তাছাড়া মুনিরার বাবা তোমাকে ছোট বেলায় পুকুরে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে ছিলো বলেই আজ তুমি....
-তুমি অন্য কিছু করে ঋণ শোধ করো কিন্তু এটা আমি করতে পারবোনা।

Valobasar Onuvuti

-তুমি আমার কথার মান রাখবেনা আফরান?
কথা শেষ না হওয়ার আগেই একটি মহিলা চেঁচিয়ে উঠলো-
এরা কি এই মেয়েকে নিবে নাকি বের করবো এরে?
অসহায় দৃষ্টিতে আফজাল সাহেব তার ছেলের দিকে তাকালো।আর তখনি আফরান মাথা নেড়ে সাই দিলো।
অবশেষে হয়ে যায় আফরান আর মুনিরার বিয়ে। রওনা হয় তারা শহরের উদ্দেশ্যে।
ঘরে পৌছে কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে সায়নী। আফরানের পাশে লাল কাতান শাড়ি পড়া মেয়ে দেখতেই বুকটা ধুক করে উঠে তার। সাথে সাথেই আফজাল সাহেব বলে উঠে--আফরানের বউ এটা। বিয়ে খেতে গিয়ে বউ নিয়ে এসেছি,হাহাহাহা।
সায়নীর মাথায় কিছু ঢুকছেনা। সে শুধুই আফরানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এক দৃষ্টিতে।

Love story

আফজাল খান ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলেন
-আফরান,মুনিরাকে তোর ঘরে নিয়ে যা।
আর সায়নী তোর খালাম্মার একটা শাড়ি এনে দে মুনিরাকে।
আফরান নতুন বউ নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে।
কিভাবে কি হলো কিছুই বুঝতে পারছেনা সায়নী।
#সায়নী....
আফরানের খালাতো বোন।৭বছর ধরে আফরানদের বাসায় থাকে সে।কারণ ৭বছর আগে এক্সিডেন্ট এ মা-বাবা,দু'জনকেই হারায় সায়নী।
সেদিনটা ছিলো তার জীবনে এক ভয়াবহ দিন।
সায়নীর পরিবার আফরানদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলো। তখন আফরানের মা ছিলো ৮মাসের প্রেগন্যান্ট। রাতের খাবার খেয়ে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছিলো।সেই সময় হঠাৎ পেটে ব্যাথা করে উঠে আফরানের মায়ের।সায়নীর মা বুঝতে পারে তার পেইন উঠেছে।এদিকে আফজাল খান বাসায় ছিলেন না।তাই সায়নীর মা-বাবা ঠিক করে তারাই আফরানের মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে।
সায়নীর মা ড্রাইভার কে গাড়ি বের করতে বলে সায়নী আর আফরানের কাছে এসে বলে-
তোরা বাসায় থাক,অফিস থেকে দুলাভাই(আফজাল খান) এলে উনাকে নিয়ে হাসপাতাল চলে আসিস।
গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যায় তারা।কিন্তু পথে এক্সিডেন্ট এ মৃত্যু হয় সকলের।

Valobasar Golpo

সেই সময় আফরানের পাশে ওর বাবা থাকলেও,সায়নীর পাশে ছিলোনা কেউ।তাই আফজাল খান সায়নীর সব দায়িত্ব নেন।
সায়নী খালাম্মার একটা জর্জেট শাড়ি নিয়ে মুনিরার কাছে আসে।সে সময় রুমে আফরান কে দেখতে পায়নি সে।
-কেমন আছো মুনিরা?
-আমার আর ভালো থাকা!
-কেনো?
-যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিলো সে মারা গিয়েছে।অপয়া বলে তাড়িয়ে দিচ্ছিলো গ্রাম থেকে,আর তখনি আমাকে বিয়ে করে উদ্ধার করেছে উনি।
-ওহ।
-আপনি কে?
-সায়নী।আফরানের খালাতো বোন।এখানেই থাকি ৭বছর ধরে।কিন্তু চিন্তা করোনা খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবো।
-কেনো?
-বিয়েতো সামনে।
-ও আচ্ছা।কিন্তু কিসের চিন্তা?
-কিছুনা।
আর কিছু না বলেই সায়নী নিজের রুমের দিকে রওনা হয়।
এদিকে আফরান নিজের ফোন-টি নিতে রুমে আসতেই দেখে শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুনিরা।কিন্তু আঁচল-টা ঠিক নেই।এমন দৃশ্য দেখে মাথাটা ঠিক রাখতে পারেনি সে। শুনিয়ে দেয় কয়েকটা কথা মুনিরাকে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুনগুন করে গান গাইছে সায়নী। পেছন থেকে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে।এই স্পর্শ তার অচেনা নয়।
-সায়নী??
আফরানের ডাকে ঘোর কাটে সায়নীর।তার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে একটু দূরে গিয়ে বলে-
নতুন বউ ফেলে তুমি এখানে কেনো?
-তোমাকে কিছু বলার আছে আমার।
-শুনতে চাইনা কিছু আমি।
-বলতে না পারলে যে আমি শান্ত হতে পারবোনা।
-শুনলে হয়তোবা আমি শান্ত থাকতে পারবোনা।যাও প্লিজ তুমি তোমার বউ এর কাছে।
কথাটি বলেই সায়নী বারান্দা থেকে চলে যেতে যায় কিন্তু হাতের টান পড়ে চলে যায় আফরানের বুকে।আফরান তার হাত ধরে টেনে নিজের বুকে নিয়ে এসেছে সায়নীকে।
আফরানের বুকে মাথা রেখে ফুফিয়ে কেঁদে উঠে সায়নী।অনেকক্ষণের জমানো কান্না বের হয়ে আসে তার চোখ দিয়ে।আফরান সায়নীর মুখ তার বুক থেকে উঠিয়ে,চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে-
এই পাগলি,আফরান শুধু সায়নীর।
-তাহলে এই বিয়েটা?
-বাবা কেমন তুমিতো জানোই।ওই মেয়েকে উদ্ধার করার জন্যই...
-শুনেছি আমি।কিন্তু সেতো তোমার বউ এখন সমাজের চোখে।
-আর তুমি?
-আমি??আমি তোমার খালাতো বোন সমাজের চোখে।
-এসব আমি মানিনা সায়নী।উদ্ধার করার দরকার ছিলো করেছি।এই মেয়েকে আমি ডিভোর্স দিবো।
-কিন্তু খালু?
-ওসব নিয়ে ভেবোনা,আমাকে কিছুদিন সময় দাও তুমি।
কথাগুলো বলে চলে যায় আফরান।কিন্তু সায়নী জানে যতটা সহজভাবে আফরান কথা গুলো বলেছে,ততটা সহজ কিছুই নয়।ওই মেয়েটা আফরানের পরিবারের,আইনের,
সমাজের চোখে তার বিয়ে করা বউ।এতই কি সহজ হবে সম্পর্ক-টা বিচ্ছেদ করা!
কিন্তু তার সম্পর্ক!সায়নী আর আফরানের সম্পর্ক-টা কি মিথ্যে ছিলো!
না,এতোদিনের মিষ্টি সম্পর্ক-টা মিথ্যে হতে পারেনা।কোথাকার কোন মেয়ে এসে আফরানকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারেনা এতো সহজেই। আফরান ঠিকই বলেছে, আফরান শুধু সায়নীর।
৭বছর আগে যখন সায়নীর মা-বাবা মারা যায়,
আফরানের বাবা সায়নীর দায়িত্ব নেয়।নিজের মেয়ের মতোই মানুষ করে তাকে।আফরানের সাথেও কখনো তুলনা করেনি।তখন তারা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ভার্সিটি-তে ভর্তির জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছিলো।দুজনেই সম-বয়সী ছিলো।সায়নী চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও আফরান পায়নি।সে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি-তে ভর্তি হয়।
সে সময় সায়নী বাসার হাল ধরে।আফজাল খান সায়নীকে পেয়ে খুবই খুশি ছিলেন।বাসার সমস্ত দায়িত্ব তিনি সায়নীকে দিয়েছিলেন।
এদিকে আফরান ছিলো দুষ্টু স্বভাবের।কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর থেকেই তার স্বভাব অনেকটা বদলে যায়।সারাক্ষণ একা থাকতো সে,নিজেকে ঘর বন্দি করে রেখেছিলো সে।এদিকে এতো বড় বাড়িতে সায়নীর একা একা সময় কাটতো না।
একদিন বলেই বসে আফরানকে-
ভাইয়া??
-হুম সায়নী বল?
-একা একা ভালো লাগেনা।তুমি কথাও বলোনা আমার সাথে।কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাবা প্লিজ??
সেদিন প্রথম আফরানের সাথে বাহিরে যায় সায়নী।সমুদ্রের পাড়ে তারা সময় কাটায়।
সেই থেকে আফরানের সাথে সায়নীর ভাব জমে।কিন্তু বুঝতে পারেনি সেদিনও এই আফরান-কে ছাড়াই একদিন সে অচল হয়ে যাবে।
-সায়নী মা??
খালুর ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বের হয় সায়নী।তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয় সে।
-খালু ডেকেছো?
-আরে ভাত খাবোতো। ক'টা বাজে খেয়াল আছে তোর?
-জ্বী দিচ্ছি।
রাতের খাবার খেয়ে আফজাল খান ও মুনিরা নিজের রুমে গেলেও ডাইনিং রুমেই দাঁড়িয়ে থাকে সায়নী-আফরান।
-যাচ্ছোনা কেনো নতুন বউ এর কাছে?
কিছু না বলেই আফরান এগিয়ে যায় নিজের রুমে।তা দেখে সায়নীর বুকে পাথর চাপা পরে।
১মিনিট-ও অপেক্ষা না করে নিজের রুমে চলে যায় সায়নী।মাটিতে বসে কাঁদতে থাকে অঝোর ধারায়।আফরান তার কথার জবাব না দিয়ে এভাবে ওই মেয়েটির কাছে চলে যেতে পারলো!
কিছুতেই শান্ত হতে পারছেনা সায়নী।নিজের পরণের কামিজ হাত দিয়ে টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে সে।আর তখনি তার হাত ধরে ফেলে আফরান।
-ছাড়ো আমাকে।
-এই পাগলি,এমন করছো কেনো?
-তুমি এমন করলে আমার কি হবে?
আমাকে কে সাপোর্ট দিবে?
-কেনো!তোমার নতুন বউ দিবে।শারীরিক,মানসিক সব সাপো....
আর কিছু বলতে না দিয়ে সায়নীর গোলাপি ঠোঁট জুড়ো নিজের ঠোঁটের মাঝে ঢুকিয়ে নিলো আফরান।সে জানে কিভাবে সায়নীকে শান্ত করা যায়।খানিকক্ষণ ঠোঁট জোড়া শুষে নিয়ে আফরান বলে উঠে-
ওই মেয়েটাকে নিজের রুম থেকে সরিয়ে এসেছি।আমার সব কিছুতেই শুধু তোমার অধিকার।
-সত্যি?
-একদম।অনেক বেশি ভালোবাসি তোমায়।
কথাটি বলেই সায়নীকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় আফরান।নিজের শরীরের ভার টুকু ছেড়ে দেয় সায়নীর শরীরের উপরে।সায়নীর মন-টা তার শান্ত করতে হবে,অবশ্য নিজের মন-ও শান্ত করতে এখন সায়নীকে প্রয়োজন তার।

(চলবে...)
writter saji afroj
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!