ছোটগল্প: সোয়েটার

-ছোটগল্প: সোয়েটার-

এই মতি আইজ যাবি?

আইজ মার অসুখ করছে রে।জলপট্টি দিতে হইবো।আইজ যামু না।মার অসুখ ভালা হইলে যামুনে।

চাচীর অসুখ করছে?আহা রে। তুই খাওন-দাওন করছস?

না রে হাছন।ঘরে খাওন নাই।মা কামে যাইতে পারলো না।মার শরীর ভালা হইয়া গেলে যখন খাওন আনবো তখন খামু নে।আমার অহন ক্ষিদা নাই।

ছোটগল্প: সোয়েটার
ছোটগল্প: সোয়েটার


হাছন কথা বাড়ায় না আর।ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে ভাঙ্গা কুটিরটার আঙ্গিনা পার হয়ে যায়।একমাত্র বন্ধু মতি না খেয়ে আছে।ব্যাপারটা মানতেই হাছনের বড্ড কষ্ট হচ্ছে।তবে কি করা যায়?

হাছন আর মতির দুজনের বয়সই দশ বছর।একই পাড়ায় মতি থাকে সর্ব পশ্চিমে আর হাছন থাকে সর্ব পূর্বে।দু বাড়ির মধ্যে দূরত্ব থাকলেও তাদের বন্ধুত্বে দূরত্বের কোনো খাঁদ নেই।

বাড়িতে এসে হাতে থাকা চটের বস্তাটা হাছন কুটিরের বাঁশের খাঁজে রেখে দেয়।তার মা গেছে বাবলা ঠাকুরের বাড়ী।এখন অগ্রাহায়নের মাঝামাঝি সময়।তাদের ভারী ধানের কাজ নেমেছে।সন্ধ্যার আগে মা আসবে না।পাতিলে রাতের জন্যে জমা রাখা ভাত আর সালুনটুকু একটা পলিথিনে পুরে নেয় হাছন।তারপর আবার দ্রুত পায়ে মতির বাসার দিকে হাটতে শুরু করে সে।

খানিক বাদে নীচু স্বরে আবার ডাক দেয়,মতি...ও মতি।

ভেজা হাতে ভাঙ্গা কুটির থেকে মতি সন্তর্পণে বেরিয়ে আসে।

মতি এই নে।আগে চাইরডা ভাত চাচীরে খাওয়াইয়া দে।তারপর তুই খাইয়া নিস।

তুই খাবার কোনহানে পাইলি?

আমাগো বাড়িতে আজ মেলা রান্ধন হইছে রে।খাওন নষ্ট হইতো তাই তোর জন্যেও নিয়া আইলাম।

পলিথিন ভরা খাবারটুকু মতি হাতে নেয়।তার দুচোখ চাকচক করে।তারপর হাছনকে উদ্দেশ্য করে বলে,তুই ভিতরে আইয়া বয়।

হাছন ভিতরে বসে।চাচীর মাথা সযত্নে দুহাতে উঁচিয়ে ধরে।তারপর হাছনের কোলে তার মাথাটা রাখে।মতি ভাত মেখে খাইয়ে দেয় মাকে।আছমা খেতে পারছেন না জ্বরের তোপে।তবুও কেনো জানি দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে।মনের মধ্যে অপার সুখ অনুভব করেন তিনি।মতি ও হাছনের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দেন তিনি...একদিন তোরা অনেক বড় হবি।

সন্ধ্যা নামতেই হাছন দুরু দুরু বুকে বাড়িতে ফেরে।মাকে কি জবাব দেবে সে ভেবে পাচ্ছে না।দাওয়ায় বসে আছেন জমিলা।সারা গা ভর্তি ঘাম।

ও মা কবে ফিরলা?

কই গেছিলি তুই?

হাছন চুপ করে থাকে।

কিরে কই গেছিলি?কথা বলস না কেন?

মা মতি আর হের মায় না খাওয়া ছিলো সারা দিন।চাচীর অনেক বেশি জ্বর।কামে যাইতে পারে নাই।তাই আমাগো ভাত আর সালুনডা তাগো ঘরে দিয়া আইছি।

জমিলা আর কিছু বলেন না।ক্ষিধায় শরীরে কোনো শক্তি পাচ্ছেন না।তবুও মনে যেনো একরাশ প্রশান্তি ছুঁয়ে গেলো তাকে।হাছন আশা করেছিলো মায়ের মার খাবে হয়তো।চুপ করে মাথাটা নীচু করে দাড়িয়ে থাকে সে।

জমিলা দরদ মাখা কন্ঠে ডাকেন,ও হাছন কাছে আয়।

হাছন ভয়ে ভয়ে মায়ের কাছে যায়।আঁচল থেকে খুলে আপেলটা হাছনের হাতে দেন জমিলা।বাবলা ঠাকুরের বাড়ী থেকে তাকে খেতে দিয়েছিলো আপেলটা।না খেয়ে আপেলটা তিনি আঁচলে বেঁধে নিয়েছিলেন ছেলের জন্যে।

হাছন হাত বাড়িয়ে আপেল নেয়।এইসব দামী জিনিস হয়তো সারা বছরে দু-একবার খেতে পায় তারা।আনন্দে হাছনের চোখে পানি এসে যায়।জমিলা একগ্লাস পানি খেয়ে ক্লান্ত শরীরটা পাটিতে এলিয়ে দেন।চোখজুড়ে রাজ্যের ঘুম।চুলা জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না তাছাড়া যেটুকু চাল আছে তা এখন চুলায় দিলে কালকের খাওয়া হবে না।

হাছনের খুব শীত লাগছে।গায়ে তার পাতলা একটা শার্ট তাও আবার হরেক দিকে ফুটো।ঠাকুরবাড়ির ছেলেগুলো কি চমৎকার সব শীতের কাপড় পড়ে।হাছন আর মতির খুব ইচ্ছে তারা ওরকম শীতের কাপড় কিনবে।সে লক্ষ্যে অনেকটা সফলও হয়েছে তারা।এ সময়টায় আজনা বিলে প্রচুর ধান হয়।রাতের বেলা বড় বড় ইঁদুর গর্ত করে সে গর্তে ধান জমাতে থাকে।একটা বা দুটো নয়।সারা বিল ব্যাপী শত শত গর্ত।দিনের বেলা সেই গর্ত খুঁড়ে সেখান থেকে ধান তোলে হাছন আর মতি।সেই ধান সুন্দর ভাবে পরিষ্কার করে তারপর গাঁয়ের বড় বাজারে বিক্রি করে তারা।কখনো একসের কখনো দুসের আর ভাগ্য ভালো থাকলে কখনো কখনো তিনসের পর্যন্ত ধান পাওয়া যায়।

পুরোনো তেলের কৌটা টা আজ চতুর্থবারের মত খুলেছে হাছন।গুনতে শুরু করলো টাকার নোটগুলো।দশটা দশ টাকা সাতটা পাঁচ টাকা আর এগারোটা দুটাকার নোট।অল্প কিছু খুঁচরো পয়সাও আছে।সর্বমোট একশত সাতষট্টি টাকা হয়েছে।আর মাত্র তেত্রিশ টাকা করে হলেই মতি আর হাছন বড় বাজার থেকে দুজনের জন্যে দুটো সোয়েটার কিনতে পারবে।হাছনের মনে আনন্দ আর ধরে না।

পরদিন আবারো মতিকে ডাকতে যায় হাছন।মতি সাড়া দেয় না।হাছন ভেতরে প্রবেশ করে।মতি তখন বসে বসে কাঁদছে।

কি হইছে রে মতি?

মায়ের অসুখ বাড়ছে।মা তো কাঁপতাছে।কথা কইতাছে না।

হাছন চাচীর কপালে হাত দিয়ে দেখে।প্রচন্ডরকম জ্বর।আছমা প্রলাপ বকছেন জ্বরের তোপে।

এহন কি করবি মতি?

ডাক্তার ডাকতে হইবো মনে হইতাছে।কিন্তু ডাকলে তো মেলা টেকা লাগবো।আমার কাছে তো অত টেকা নাই।একশু ষাইট টেকা আছে।

কিছুক্ষণ ভাবে হাছন।তারপর বলে চল একটু মাঠে যাই।আমি গিয়া বস্তাডা আনতাছি।চাচী একটু কষ্ট কইরা একা থাকুক।আইজ তাড়া কইরা খুঁজমু ধান।তারপর চাচীরে ডাক্তার দেখামু।চল মতি চল।

বা হাতে চোখ মুছে মতি।ওঠে দাড়ায় সে।তারপর মাকে কাঁথা জড়িয়ে রেখে চটের বস্তা হাতে নেয়।বেরিয়ে পড়ে দুজনে একসাথে।

প্রাণপণে দৌড়ায় হাছন।কুটিরের খাঁজ থেকে তার বস্তাটা হাতে নেয় আর টিনের কৌটা থেকে টাকাগুলো পকেটে পুরে।চাচীর জন্যে ডাক্তার আর ঔষধ লাগবে।অনেক টাকার ব্যাপার।মতির একার টাকায় হবে না।

সূর্যের আলো ফুরিয়ে আসছে।গর্তের পর গর্ত খুঁড়ে চলেছে তারা দুজন।ঘেমে একাকার তাদের ছোট্ট শরীর দুটো।একটু দূর থেকে মতিকে উদ্দেশ্য করে হাছন বলে উঠে..... হাত চালা মতি।আরো জোরে হাত চালা।বেলা ফুরায়ে আইতাছে।সূর্য এত তাড়াতাড়ি ডোবে কেন?

ছোটগল্প: সোয়েটার

লেখক: আবদুল্লাহ ইবনে আলী

পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!