অণুগল্প লেইট বেবি

অণুগল্প লেইট বেবি


আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটের স্টুডেন্ট। হঠাৎ শুনি আমার আম্মু কনসিভ করেছেন। এই খবর আমি শোনার আগেই পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে। রাস্তায় লোকজন আমায় দেখলেই জিজ্ঞেস করে, আমার আম্মুর কী অবস্থা? ঠিকমতো চেক আপ করাচ্ছেন তো? আসলে লেইট বেবি হলে না-কি একটু বেশিই সচেতনতা অবলম্বন করতে হয়। আবার অনেকে আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফিসফিস করে বলে, কী যুগ এলো! ঘরে বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে থাকতে না কি আবার নতুন করে বাচ্চা নিতে হয়। ছিঃ ছিঃ লাজ-লজ্জা দিন দিন উঠে যাচ্ছে দুনিয়া থেকে।

অণুগল্প লেইট বেবি
অণুগল্প লেইট বেবি

পাড়ার লোকদের কথা শুনলে রাগে আমার গা রি রি করতো। চুপচাপ মাথা নিচু করে সেখান থেকে প্রস্থান করতাম। আমার বন্ধু-বান্ধবরা আমায় নিয়ে মজার ছলে বলতো, কীরে কিছুদিন পর তো বাবুর ডায়াপার চেইঞ্জ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাবি। এক্সামের প্রিপারেশন নিবি কীভাবে? কথাগুলো বলেই হাসাহাসি শুরু করতো। বন্ধু-বান্ধবের এই হাসি ঠাট্টা আমি সহ্য করতে পারতাম না। ধীরে ধীরে ওদের থেকে দূরে সরে যাই। পাড়া-পড়শী, বন্ধু-বান্ধব সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিই। একা আসি, একা যাই। বাসায় যেটুকু সময় থাকি, সেটুকু সময় আম্মুকে বাজে কথা শুনাই। আসলে সবার রাগটা আম্মুর উপর ঝাড়তাম। আমার ব্যবহারে আম্মু নীরবে কাঁদতেন। আমার সামনে দুই মিনিটও দাঁড়াতেন না তিনি। আমার ছোট দুই বোন আম্মুর যত্ন নিতো। অথচ, বড় মেয়ে হিসেবে যেখানে আমার যত্ন নেওয়ার কথা, সেখানে আমি করতাম দুর্ব্যবহার।
আব্বুও লজ্জায় আমার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। সকালে আমি ঘুম থেকে উঠার আগেই বাসা থেকে বের হয়ে যেতেন। রাতে বাসায় এসে সদর দরজা থেকে আমার রুমের দরজায় তাকাতেন। দরজা লক দেখলে চুপচাপ নিজের রুমে চলে যেতেন। রাতের খাবার নিজের রুমেই খেতেন। অথচ, আব্বু আগে আমাকে রেখে রাতের খাবার খেতেনই না। আজ তিনিই আমার থেকে লুকিয়ে একা একা ঘরের মধ্যে খাবার খান।
আব্বুর এমন দূরে সরে যাওয়া আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো আম্মুর নতুন বাবুটা দুনিয়াতে আসার আগেই আমার আব্বু-আম্মুকে আমার থেকে কেড়ে নিচ্ছে। রাগ হতো। ঘরের জিনিসপত্র ছুড়তাম রাগের জন্য। ছোট দুইটা বোন আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো। এখন ভয়ে আমার কাছে অবধি আসে না। রাতে দাদুর কাছে ঘুমায়। চারপাশ থেকে আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে গেলাম। পুরো পৃথিবীতে আমার কেউ নেই।
দাদু আমাকে বোঝাতেন। বলতেন,
"বইন রে, এমন করে না। সন্তান হলো আল্লাহর নেয়ামত। এভাবে অনাগত সন্তানকে অবহেলা করতে নাই। এতে অমঙ্গল হয়। অনেকে কতো সাধনা করেও একটা বাচ্চা পায় না। আর তোর মা তো তিনটা মেয়ের পর আরো একটা সন্তান জন্ম দিতে যাইতেছে। তোর মায়ের উপর আল্লাহর রহমত আছে। এমন খারাপ ব্যবহার করিস না মায়ের সাথে। আল্লাহ নারাজ হবেন। মায়ের বদদোয়া লাগলে জীবনে সুখ পাবি না। যদিও মায়েরা কখনো সন্তানদের বদদোয়া দেয় না। কিন্তু রুহের দোয়া, বদদোয়া বলেও একটা কথা আছে বইন। তুই এমন অবুঝ হইস না বইন।"
দাদূর কথাগুলো শুনে নিজেকে কিছুটা মানিয়ে নিতাম এমন পরিস্থিতির সাথে। কিন্তু ওই যে সমাজ, সমাজের লোকদের সেই আজেবাজে কথা শুনলেই আমি রেগে যেতাম। আর আম্মুর সাথে খারাপ ব্যবহার করতাম।
দীর্ঘ দশ মাস আম্মু অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে একটা ফুটফুটে ছেলে সন্তান জন্ম দিলেন। হ্যাঁ, আমার আম্মু জন্ম দিলেন লেইট বেবি। আমি প্রথমে আমার ভাইয়ের মুখ না দেখলেও পরে আর লোভ সামলাতে পারলাম না। ভাই হওয়ার দুইদিন পর ওকে প্রথম দেখি। কোলে নিই। ওর সেই নিষ্পাপ চাহনি দেখে আমি গলে যাই। ওর কোমল হাতগুলো ধরে নিজেকে সবথেকে সুখী মনে হতে লাগলো। ওর পাতলা ঠোঁটগুলো দিয়ে আমার গালে স্পর্শ করাতাম। আম্মুর সাথেও ধীরে ধীরে মিশে যেতে লাগলাম। এখন আর পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব কারো তোয়াক্কা করি না। ভাইকে নিয়েই আমার দিন কাটতে থাকে। ওর হাসিতেই হাসতাম। ও কাঁদলে কোলে নিয়ে পুরো বাসা ঘুরাতাম, কান্না থামাতাম। আম্মুর কাছে ভাইকে তেমন একটা দিতামই না। শুধু খাওয়ার সময় আম্মু খাওয়াতো। আর বাকি সময় ও আমার কাছেই থাকতো। আমার এমন পরিবর্তনে সবাই খুব খুশি হয়েছিলো। আব্বু আবার আমার আগের আব্বু হয়ে গিয়েছিলো। আমার তিনভাই-বোন আর আব্বু আম্মুকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিলো আমার ছোট্ট স্বপ্নপুরী।

ভাইয়ের যখন তিনবছর তখন আমার বিয়ে হয়ে যায়। ভাইকে ছেড়ে যেতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো। সত্যি বলতে এই তিনবছর আমার প্রতিটা মুহুর্ত কেটেছে আমার ভাইয়ের সাথেই। তাই ওকে ছেড়ে আসতে প্রচন্ড কষ্ট হয়েছিলো। বিয়ের দু'বছরের মাথায় আমি জানতে পারলাম আমি কখনো সন্তান জন্ম দিতে পারবো না। আমার জরায়ুতে টিউমার ধরা পড়ে। আমি হয়ে যাই বন্ধ্যা। দাদুর বলা কথাগুলো মনে হলো, সন্তান হলো আল্লাহর নেয়ামত। আল্লাহ যার উপর করুণা করেন, দয়া করেন, তাকেই সন্তান দান করেন। আমার আম্মুর উপর সত্যিই আল্লাহর রহমত ছিলো। আর আমার উপর? আল্লাহ নারাজ। হয়তো এগুলো আম্মুর রুহের বদদোয়া। হয়তো আম্মুর সাথে করা খারাপ ব্যবহারের ফল। যাকে বলা হয়, 'রিভেঞ্জ অফ ন্যাচার। হ্যাঁ, প্রকৃতি তার প্রতিশোধ ঠিক নিয়ে নিলো।'
সারাদিন রাত কান্নাকাটি করতাম। আমার হাজবেন্ডকে বলতাম আমায় ডিভোর্স দিয়ে দিতে। আমার জন্য ও কেন বাবা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হবে? কিন্তু ও আমাকে বোঝাতো এমন পাগলামি না করতে। কিন্তু আমার পাগলামি দিনদিন বেড়েই চলেছিলো। আমাকে আমার আব্বু আম্মু তাদের কাছে নিয়ে যায়। শুরু হয় আবার ভাইয়ের সাথে দিন কাটানো। ভাইয়ের সাথে থাকতে থাকতে সন্তান না হওয়ার দুঃখটা কিছুটা হলেও লাঘব হয় আমার। এখন আম্মুর লেইট বেবিই আমার হেসে খেলে বাঁচার একমাত্র মাধ্যম। ওর মুখের দিকে তাকিয়েই আমি ভুলে থাকতে পারি আমি একজন বন্ধ্যা নারী।
.
অণুগল্প
লেইট বেবি
লেখনীতে- Ifra Chowdhury
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!