সুখের পায়রা ফাবিহা ফেরদৌস

সুখের পায়রা
ফাবিহা ফেরদৌস

সুখের পায়রা
সুখের পায়রা

 সম্পর্কের দু বছরের মাথায় আমরা বিয়ে করি। বিয়ে নিয়ে হাজার স্বপ্ন দু চোখে তখন। দুজনের মধ্যে কার কেমন চাওয়া পাওয়া খুব ভালো করে ই জানতাম আমরা! বলা যায় নতুন এক ফ্যান্টাসি জগতে ঢুকেছি এমন লাগছে। বিয়ের প্রথম কয়েকটা দিন বেশ ভালো ই কেটেছে।

নতুন পরিবারে সবার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে যতটুকু সম্ভব নিজেকে নিয়োজিত রাখা যায় তা ই করেছি।
আস্তে আস্তে দেখলাম সবকিছুর মধ্যদিয়ে ভালো কাটলেও বিয়ের আগে দেখা স্বপ্নগুলোর মিলরেখা পাচ্ছি না।
আমার শ্বশুরবাড়ির পরিবারটা একটু বড় আমার স্বামী আদিব সহ তারা তিন ভাই আর চার বোন। চার বোনের মধ্যে বড় দুজনের বিয়ে হয়ে গেছে।
বাকি আছে ছোট দুই ননদ।
মোটামুটি একটা মিডিয়াম পরিবার যেখানে স্বভাবতই অনেক কাজ থাকে। সে সব নিয়ম কাজ সেরে নিজের জন্য নিজেদের জন্য আলাদা সময় টুকু আর মিলে না। অথচ আদিবের সাথে কথা ছিলো সপ্তাহে একদিন ঘুরতে যাওয়া নিজেদের আলাদা একটা সময় আরো শখের কিছু কথা গুলো যেন মনবাক্সে বন্দি হয়ে রইল।
আদিব আদিবের মত ই ব্যস্ত। পরিবারের বড় ছেলে তাই দায়িত্বটটা একটু বেশি ই ছিলো। কেয়ার ঠিক আগের মত ই ছিল তবে বউ আর প্রেমিকার মধ্যে কি পার্থক্য তা আমার বুঝা হয়ে গেছিলো।
মাঝে মাঝে রাতে আদিবের সাথে ঠিক রাগ না অভিমান করতাম। বড্ড অভিমান নিয়ে যখন ওর কাছে অভিযোগ করতাম তখন সে খুব সহজে বুকে আগলে নিয়ে আমাকে বলত একটা সুযোগ করে নিবো নিজেদের জন্য। সংসারটা একটু গুছিয়ে নাও তুমি।
তখন আমিও আর কিছু বলতে পারতাম না প্রিয় মানুষটার বুকে যখন এভাবে জায়গা মিলে যায় তখন আর কোনো মেয়ের ই কিছু চাওয়ার থাকে না।
হুট করে পরদিন বিকেলে অফিস থেকে তাড়াতারি ফিরে আদিব পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল দেখেছো বলছিলাম না সুযোগ! সেটা পেয়ে গেছি।
ওর একটা অফিসের প্রজেক্টের জন্য চট্টগ্রাম যেতে হবে সেই কাজের উসিলায় হোক ঘুরে তো আসা যাবে! শুনে আমার মনটা নেচে উঠল। অনেক দিন খোলা আকাশে ঘুরে বেড়াই না !
বাবা মায়ের কাছ থেকে পারমিশন পাওয়া হয়েও গেল.. কিন্তু যাবার দিন সকালে বাধলো বিপত্তি।
শাশুড়ি বাথরুমে পড়ে গিয়ে কোমড়ের একপাশে খুব বড়সর ব্যথা পেলেন!
তখন নিজের বিবেকের কাছে ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রইলাম পারলাম না আদিবের সাথে যেতে। ঘরের একমাত্র বউ চাইলে ই সব হয় না।
আমার মন খারাপ হয়নি এ জন্য তবে আদিব কয়েকদিনের জন্য এই প্রথম আমার থেকে দূরে যাচ্ছে ভাবতে ই একটু কষ্ট লাগছিলো।
শাশুড়ি মা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সেদিন!
আদিব প্রায় এক সপ্তাহ পর ফিরলো। কাজের চাপ ছিলো খুব তাই খুব বেশি কথা হয়নি তারও আমারো শাশুড়িকে দেখতে অনেক মেহমান আসছিলেন বাসায়।
সেখান থেকে কেনা সবার জন্য উপহার সবাইকে দিয়ে দিল।
আমি কেন জানি না ওর সামনে মন খারাপ করে বসে ছিলাম। ব্যাগ থেকে বেশ কয়েকটা প্যাকেট আমার সামনে আনলো বলল সব তোমার..!
আমি এতগুলো প্যাকেট দেখে বললাম এতকিছুর তো দরকার নেই আমার। আমার এই মানুষটা আমার কাছে থাকলে আমাকে একটু সময় দিলে তাতে ই ঠিক চলবে আমার।
তখনি সে জড়িয়ে ধরে বলল
তাই তো প্রত্যেকটা সময় তোমাকে মিস করেছি আর যখন যা সামনে পেয়ে ভালো লেগেছে তোমার জন্য কিনে রেখে দিয়েছি।
সত্যি এই অনুভূতি গুলো অদ্ভুত! প্রেমিকা ছিলাম যখন এই অনুভূতির সাধ পাইনি আমি। বুঝলাম আজ সবাই কেন প্রিয় মানুষটাকে তার জীবনসঙ্গি হিসেবে চায় আর একজন বউ আর প্রেমিকার ভালোবাসায় কতটুকু পার্থক্য আর পবিত্রতা থাকে।
ভালো ই চলছিলো সংসার আমার অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছি নিজের মত করে। আমার হাতের চা ছাড়া আমার শ্বশুর এর দিন চলে না। দেবর গুলো আসলে ই ভাইদের মত খুনশুটি আর ননদগুলো আপন ছোটবোনের মত আমাকে তর্কে আড্ডায় জিতিয়ে দিতো আর প্রতিদিন শাশুড়ির নতুন নতুন রান্না আর পুরনো দিনের গল্প বেশ কেটে যেত সময়।
বুঝতে পারলাম সংসার সুখ কি। কিভাবে একটা মেয়ে নারী হয়ে একটা ঘরে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। আগে বুঝতাম ঘর মানে দমবন্ধ সবকিছু।
তবে কাজের চাপ একটু বেশি ই ছিলো।
বাবার বাড়ি থেকে সবাই পিকনিকে যাবে ডেইট ফিক্সড করে আমাদের জানানো হল কিন্তু সেদিন আমার ননদ তিথির জন্য পাত্রপক্ষ আসবে শেষ ক্যান্সেল।
সবাই সেখানে আনন্দ করবে মজা করবে ভেবে মনটা হটাৎ কিশোরীদের মত কেঁদে উঠল। আমি রান্নাঘরের একপাশে গিয়ে চোখ মুছলাম।
তখন ই শ্বশুর এসে বললেন সব রেডি তো বউমা?
আমিও মিস্টি হেসে বললাম সব রেডি।
কিশোরী মনটা আবার একজন সংসারী নারীতে পরিনত হল। সবকিছু আবারো নিজের মত সামলে নিলাম। অনেক অনেক ক্লান্ত লাগছিলো।
দিন শেষে ভাবছিলাম কোথায় বিয়ের আগে দেখা সেই ফ্যান্টাসি জীবন আর কোথায় বাস্তবতা..
দিনগুলো এভাবে ই কাটছিলো নিজের প্রতি আলাদা সময়ের কথা যেন ভুলে ই গেছি। সবার ভালো থাকা সবাইকে ভালো রাখাতে ই যেন এখন নিজের ভালো থাকাটা হয়ে গেছে।
ননদের বিয়ের ধুমটা গেলো। তার মধ্যে আমারো শরীরটা খুব একটা ভালো মনে হল না। কেমন জানি দূর্বল লাগে।
রাতে ঔষুধ খেয়ে খুব তাড়াতারি ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ চারদিকে কিসের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো। চোখ খুলতে ই দেখি সবাই বিছানার পাশে দাড়িয়ে আমাকে জন্মদিনের উইশ করছে।
আমি অবাক হয়ে আছি ভুলে ই গিয়ে ছিলাম জন্মদিনের কথা। এত ভালো লাগছিল দেখে শ্বশুর শাশুড়ি সবাই কেমন জানি কান্না চলে আসছিলো।
মাথা ধরাটা একটু হালকা লাগছিলো। বিছানা থেকে নামতে ই শাশুড়ি মা খুব সুন্দর একটা জামদানি নিয়ে এসে রেডি হতে বললেন আমি আরো অবাক হয়ে যাই। সত্যি এরকম কিছু আমি কল্পনাও করিনি।
রেডি হয়ে কেক কাটলাম। জন্মদিনের আরেক দফা খাওয়াদাওয়া হল। রান্না ঘরে সবকিছু রাখতে গিয়ে হটাত শুনলাম শাশুড়ি বলছেন,
মনে আছে বিয়ের আগে তুমিও এভাবে আমাকে অবাক করে দিতে!! এরপর কত বছর পেরিয়ে গেছে খেয়াল ই করিনি আমাদের সংসার জীবন।
রান্নাঘরের সবকিছু একটু গুছিয়ে রেখে শুয়ে পড়লাম। আরেকটা জিনিস বাকি তা হয়ত কেউ খেয়াল করেনি বা করেও এড়িয়ে যাচ্ছে। সকাল বেলা আদিব তাড়াহুরু করে অফিসে চলে গেল।
কিছু ই বলতে পারলাম না দুপুরের খাওয়া শেষে ফোন দিলাম।
অল্প একটু কাজ ঠিক মত যেন হয়ে যায়। বলে রেখে দিলাম।
আদিব বিকেলে ফিরলো। বাবা মা কে রেডি হতে বলল। আমরা সবাই রেডি হয়ে নিচে নামতে ই আরো অবাক হলাম।
আদিব কানে কানে বলল তুমি শুধু পারো আমি পারিনা! নিচে হল রুমে একটা রিকশা খুব সুন্দর করে সাজানো গুছানো।
" হেপি অ্যানিভার্সারি " বলে বাবা মা কে শুভেচ্ছা জানালাম। আর তাদের জন্য এই রিকশা। তারা আগে যেমন এক রিকশায় করে ঘুরতো ঠিক তেমনি আজকেও তাই হবে। বাবা মা অনেক খুশি তারপরও হয়ত লজ্জা পাচ্ছিলেন।
আমিও বললাম আমরা রেস্টুরেন্ট এর দিকে যাচ্ছি তোমরা রিকশায় ঘুরে ইচ্ছে মত রেস্টুরেন্টে চলে এসো।
বলে ই আমরা গাড়িতে উঠলাম কিন্তু ঠিক দেখলাম ওই রিকশায় উঠা মানুষ দুটো একে অন্যের প্রতি যেন আগের অনুভূতি নিয়ে বসে আছে হাতে হাত ধরে মুখে মিস্টি হাসি নিয়ে।
রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষে আমি বাবা মা'কে
খাম এগিয়ে দিলাম। উনাদের এ্যানিভারসারি গিফ্ট। খাম খুলে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
অনেক কিছু তো করলে মা এই সংসার জীবনে এবার না হয় নিজেদের জন্য কিছু হোক। ঘুরে আসুন কয়েকটা দিন।
আমার কথা শুনে শাশুড়ি বললেন
বউমা এখন তোমাদের সময় এগুলোর।
আমিও বললাম তা আমাদের সময়ে আপনিও তো স্বপ্নগুলো ইচ্ছেগুলো এক কোণে ফেলে রেখেছেন তখন তো কেউ বলেনি আপনাকে। আজ না হয় একটু বিশ্রাম নিন। জীবনের একটু সময় না হয় সারা জীবন পাশে চলার মানুষকে নিয়ে বিকেলের সূর্যাস্ত টা দেখুন।
দেখলাম বাবা মা দুজনের চোখে পানি..!!
মন ভরে দোয়া করলেন আমাদের জন্য আমার এতটা ভালো লাগছিল মনটা ভরে গেল অন্যরকম সুখে।
রাতে ছাদে বসে আছি আদিবের সাথে।
ওর কাধে মাথা রেখে।
আদিব বলল তুমি না এগুলো আমাদের জন্য জমিয়ে ছিলে ঘুরতে যাবে বলে।
আমিও বললাম হুমম জমিয়ে ছিলাম তো আমাদের জন্য ই তা বাবা মা কি আমাদের না..!!
আদিব শক্ত করে হাতটা ধরে আছে আমার।
জীবনটা ফ্যান্টাসি না ঠিক তবে সুখ গুলো খুঁজে নিতে হয় যে সুখগুলো তে অন্যরকম ভালোবাসা থাকে যে সুখগুলো তে মনের আত্মতৃপ্তি থাকে।

সুখের পায়রা
ফাবিহা ফেরদৌস
পোস্ট রেটিং করুন
ট্যাগঃ
About Author

টিউটোরিয়ালটি কেমন লেগেছে মন্তব্য করুন!